মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
জন্মিলে মরিতে হবে—এ সত্য চিরন্তন। কিন্তু মৃত্যুর পর একজন মানুষকে শেষ বিদায় জানাতেও যে প্রকৃতির এমন নির্মম পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে, তা যেন বন্যাকবলিত চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে না গেলে বিশ্বাস করা কঠিন।
সেখানে বসবাস করতেন পেশায় গাড়িচালক মোহাম্মদ ফোরকান। চলমান ভয়াবহ বন্যার মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মৃত্যুর পরও যেন শেষ হয়নি তার পরিবারের দুর্ভোগ। চারদিকে শুধু অথৈ পানি। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, বাড়ির আঙিনা, চলাচলের সব পথ। স্বজন হারানোর গভীর শোকের মধ্যেই পরিবারের সামনে দেখা দেয় আরেক কঠিন প্রশ্ন—কীভাবে মরদেহ কবরস্থানে নেওয়া হবে? কোথায় হবে দাফন?
আশপাশে দাফনের উপযোগী কোনো শুকনো জায়গা না থাকায় স্বজন ও প্রতিবেশীরা এক ব্যতিক্রমী উপায় খুঁজে নেন। কয়েকটি কলাগাছ একসঙ্গে বেঁধে তৈরি করা হয় একটি ভেলা। সেই ভেলার ওপর অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে রাখা হয় ফোরকানের মরদেহ। এরপর বুকভরা শোক আর চোখভরা অশ্রু নিয়ে স্বজনরা বন্যার উত্তাল পানি পাড়ি দিয়ে রওনা হন দূরের কবরস্থানের উদ্দেশ্যে।
প্রকৃতি একদিকে যেমন অসহনীয় কষ্ট দিয়েছে, অন্যদিকে সেই প্রকৃতিরই উপহার কলাগাছকে ভেলা বানিয়ে মানুষ চেষ্টা করেছে শেষ দায়িত্ব পালন করতে। চারদিকে শুধু পানি, আর তার মাঝখানে ভেসে চলেছে একজন প্রিয় মানুষের নিথর দেহ—এই দৃশ্য উপস্থিত সবার হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তোলে।
দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য পথ অতিক্রম করে অবশেষে মরদেহ পৌঁছানো হয় দূরের কবরস্থানে। সেখানে জানাজা শেষে সম্পন্ন হয় দাফন। স্বজনদের কান্না, প্রতিবেশীদের সহযোগিতা এবং মানবিকতার এই নিঃশব্দ অধ্যায় বন্যার ভয়াবহতার এক মর্মস্পর্শী দলিল হয়ে থাকবে।
ফোরকানের শেষযাত্রা শুধু একটি পরিবারের শোকগাঁথা নয়; এটি বন্যাকবলিত জনপদের অসহায় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এমন এক বাস্তবতা, যেখানে জীবিতরা বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছেন, আর মৃত মানুষকেও শেষ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতে পাড়ি দিতে হচ্ছে বন্যার উত্তাল জলরাশি। প্রকৃতির এই নির্মম রূপের মাঝেও মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধই হয়ে উঠেছে মানবতার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।