নিউজ ডেস্ক
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর), ২০২৬ | সকাল ১১টা ১৪ মিনিট
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য আলোকবর্তিকা গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ি। মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রবর্তক শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এই পুণ্যভূমি বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভক্তদের কাছে প্রধান তীর্থস্থান। প্রতি বছর এখানে আয়োজিত মহাবারুণী মেলা ও স্নানোৎসবকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে।
ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ি মূলত হরিচাঁদ ঠাকুরের পৈতৃক নিবাস। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৭৯৯ থেকে ১৮১২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি এখানে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা রামরাম ঠাকুর ও মাতা বিমলা দেবী নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন। হরিচাঁদ ঠাকুর জাতিভেদ প্রথা, কুসংস্কার ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি ‘হরিনাম’ কীর্তনের মাধ্যমে ঈশ্বরের উপাসনা ও মানুষের সমতার বাণী প্রচার করেন।
স্থানীয় ভক্তরা জানান, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলায় যখন সাধারণ মানুষ নিপীড়িত ছিলেন, তখন হরিচাঁদ ঠাকুর ‘মতুয়া আন্দোলন’ গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে তার পুত্র শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এই আন্দোলনকে আরও বেগবান করেন। হরিচাঁদ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই গ্রামটি বর্তমানে বিশ্বের মতুয়া ভক্তদের কাছে ‘শ্রীধাম ওড়াকান্দি’ হিসেবে পরিচিত।
ঠাকুর পরিবারের সদস্য শিবু ঠাকুর বলেন, “মতুয়া ধর্মের মূল ভিত্তি মানবপ্রেম, সাম্য ও আত্মশুদ্ধি। হরিচাঁদ ঠাকুরের বাণীতে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সমঅধিকারের কথা উঠে এসেছে। জাতি, ধর্ম বা বর্ণের ভেদাভেদকে গুরুত্ব না দিয়ে এখানে মানুষের মর্যাদাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।”
টাঙ্গাইল থেকে আসা মতুয়াভক্ত বাসুদেব বলেন, “এই ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে অনুষ্ঠিত মহাবারুণী মেলা ও স্নানোৎসব। ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কামনা সাগর ও দুধসাগর পুকুরে পুণ্যস্নান করেন ভক্তরা। খোল-করতালের তালে হরিনাম সংকীর্তনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।”
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ষষ্ঠ পুরুষ সুব্রত ঠাকুর বলেন, “ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ি আজ শুধু একটি ধর্মীয় তীর্থক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও লোকায়ত সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী প্রতীক। বিশ্ববাসীর কাছে মানবতা, শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা পৌঁছে দিতে এই জনপদের ভূমিকা অপরিসীম।”
কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহিন মিয়া বলেন, “ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। প্রতি বছর ঠাকুরের জন্মতিথিতে ভক্তদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হয়। এটি শুধু কাশিয়ানীর নয়, গোপালগঞ্জ জেলারও গৌরব।”