মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সুখছড়ী মৌজায় জাল দলিলের মাধ্যমে নামজারি খতিয়ান সৃজনের অভিযোগে দায়ের করা মিস মামলায় খতিয়ান বাতিলের আদেশের পর পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পুনঃতদন্তের আদেশের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মামলাটির নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মিস মামলার বিবাদী পক্ষ। তাঁদের অভিযোগ, রায়ের নকল সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁরা পুনঃতদন্তের আদেশের বিষয়টি জানতে পারেন ১ মাস পরে। এ ঘটনায় ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
বিবাদী পক্ষের দাবি, শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট দলিলটি জাল প্রমাণিত হওয়ায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁদের পক্ষে খতিয়ান বাতিলের আদেশ দেন। রায়ের নকল কপি সংগ্রহের জন্য অফিস সহকারী রবিউল এর কছে যোগাযোগ করলে নানা অজুহাতে বিবাদীদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁদের জানানো হয়, মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময়েও তদন্ত কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এ ঘটনায় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে রায়ের আদেশ বাস্তবায়ন আটকে রাখা হয়েছে বলে সন্দেহ করছেন ভুক্তভোগীরা। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি।উক্ত মিস মামলার প্রধান বিবাদী নুরুল আমিন বলেন সায়েরা খাতুন মৃত্যুকালে ২ছেলে ও ৪ জন মেয়ে রেখে মৃত্যুবরণ করেন।মৃত্যুকালে তিনি আর এস মূলে ১৫ কানি জমি রেখে যান। তারা ওয়ারিশ মূলে বিএস রেকর্ডিয় খতিয়ান মতে নাম জারি করেছে। তিনি বলেন সায়েরা খাতুন সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় কাউকে দলিল দেয়নি। তিনি আরো বলেন, ছাযেরা খাতুনের মৃত্যুর পর ২৬/১১/১৯৭৩ ইংরেজি তারিখে ভুয়া দলিল বানিয়ে পদুয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গত বছর নামজারি করতে যায়। তখন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তার দলিল ভুয়া বলে প্রমাণ করে বিধায় পরবর্তীতে ইব্রাহিম (আমিন) নামের এক সার্ভেয়ার তাঁর মামাতো ভাই নুরুল আমিনের নামে ২৬/১১/১৯৮৬ ভুয়া দলিল তৈরি করে নামজারি করে দেন বলে তাঁদের অভিযোগ।
এ নিয়ে দায়ের করা মিস মামলার বাদী নুরুল আমিন, যিনি মৃত আব্দুস সাত্তারের ছেলে। উক্ত মিস মামলার প্রধান বিবাদী নুরুল আমিন, আইয়ুব আলী এর পক্ষে ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) রায় দেন। কিন্তু রায়ের নকল সংগ্রহ করতে গেলে অফিস সহকারী রবিউল ও নুরুল ইসলাম বিভিন্ন অজুহাত দেখান। একপর্যায়ে রায় ঘোষণার প্রায় এক মাস ১০ দিন পর তাঁদের জানানো হয়, মামলাটি পুনঃতদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য নতুন করে ১৪৩/২৬ নম্বরে ডকেট খোলা হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পারেন।
আবেদনকারীদের দাবি, সুখছড়ী মৌজার সংশ্লিষ্ট জমি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি। তাঁদের দাখিল করা আবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের ২৬ নভেম্বর ২৪৮৮ নম্বর দলিলের মাধ্যমে ৭ কানি ৬ গণ্ডা ২ কড়া এবং একই তারিখে ২৪৪০ নম্বর দলিলের মাধ্যমে ৪০ শতক জমি তাঁদের বাবা ক্রয় করেন। পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশসূত্রে তাঁরা এসব জমির মালিকানা লাভ করেন এবং ভোগদখল করে আসছেন।
তাঁদের ভাষ্য, স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, প্রতিপক্ষের নামে ওয়ারিশসূত্রে সংশ্লিষ্ট জমির নামজারি করা হয়েছে। পরে পৈতৃক ক্রয়সংক্রান্ত দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্র দেখিয়ে তাঁরা বিরোধীয় খতিয়ান বাতিলের জন্য মিস মামলা করেন।
আবেদনকারীদের মতে, তাঁদের দাখিল করা দলিল অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বি.এস. রেকর্ডীয় মালিক ১৯৭৩ সালে দুটি দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তর করেছিলেন। ফলে ওই জমি ওয়ারিশসূত্রে প্রতিপক্ষের নামে নামজারি করার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে তাঁরা বিরোধীয় নামজারি খতিয়ান বাতিল করে জমি মূল বি.এস. খতিয়ানে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
ভূমি অফিসে দাখিল করা আবেদনে নুরুল আমিন ও আহমদ হোসেন গং কে আবেদনকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিপক্ষ হিসেবে পাঁচজনের নাম রয়েছে। আবেদনটিতে সুখছড়ী মৌজার নামজারি মামলা নম্বর ৪০০৯/২৩-২৪-এর মাধ্যমে সৃজিত ৩৮৮ নম্বর খতিয়ান বাতিলের আবেদন করা হয়।
এ ছাড়া নথিতে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার সুখছড়ী মৌজার ২৫-৪০৬৮ নম্বর খতিয়ান, ৮০৯ (IX-1)/২০২৫-২৬ নম্বর নামজারি মামলা এবং ৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে নামজারি সম্পাদনের তথ্যও উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে লোহাগাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন বলেন, মামলাটির পুনঃতদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। তবে পুনঃতদন্তের নির্দেশ কেন দেওয়া হয়েছে? তদন্ত কার্যক্রম কত দূর এগিয়েছে? এবং অভিযোগকারীদের উত্থাপিত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য কী—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, সরকারি বিধি মোতাবেক নিয়ম আছে যে, রায় হয় একবার আপিল করলে বিবাধীরা করতে পারেন।
সরকারি বিধি অনুযায়ী, কোনো মামলায় রায় ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট পক্ষের আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তবে আপিলের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পুনঃতদন্তের আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে কী আইনি ভিত্তি রয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।