মক্কার কাবা মুসলমানদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থান। প্রতি বছর হজের সময় লাখো মানুষ এই ঘর তাওয়াফ করেন। কাবা ঘরের কালো গিলাফ বা কিসওয়া আজ একটি সুপরিচিত দৃশ্য। কিন্তু এই গিলাফ পরানোর ঐতিহ্য কবে শুরু হয়েছিল—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় ইসলাম আগমনেরও কয়েক শত বছর আগে, ইয়েমেনের এক শক্তিশালী রাজার কাছে।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
ইতিহাসবিদদের মতে, কাবা ঘরে সর্বপ্রথম গিলাফ পরিয়ে দেন ইয়েমেনের হিময়ারি সাম্রাজ্যের রাজা, যিনি “তুব্বা” নামে পরিচিত ছিলেন। তার প্রকৃত নাম ছিল আবু কারিব আস‘আদ।
আরব ইতিহাসে “তুব্বা” ছিল ইয়েমেনের রাজাদের একটি উপাধি। আবু কারিব আস‘আদ ছিলেন শক্তিশালী শাসক, যার সাম্রাজ্য দক্ষিণ আরব থেকে উত্তর আরব পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একসময় তিনি উত্তর দিকে অভিযান চালিয়ে ইয়াসরিব শহরে (বর্তমান মদিনা) পৌঁছান।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়, তিনি সেখানে তার এক পুত্রকে শাসক হিসেবে রেখে যান। কিন্তু পরে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষে তার পুত্র নিহত হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ইয়াসরিব ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু তখনই ঘটেছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
বলা হয়, ইয়াসরিবে বসবাসকারী দুইজন ইহুদি আলেম তুব্বা রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা তাকে বলেন, এই শহর ধ্বংস করা ঠিক হবে না, কারণ ভবিষ্যতে এখানে একজন মহান নবীর আগমন ঘটবে। এই কথা শুনে তুব্বা রাজা শহর ধ্বংসের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
ইতিহাসের কিছু বর্ণনায় এমনও বলা হয়, তিনি একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং মূর্তিপূজা থেকে সরে আসেন।
ইয়াসরিব থেকে ফেরার পথে তুব্বা রাজা মক্কায় আসেন। কিছু বর্ণনায় উল্লেখ আছে, প্রথমে তিনি কাবা ঘর আক্রমণ বা ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু আবারও আলেমদের পরামর্শে তিনি জানতে পারেন, কাবা ইবরাহিম (আ.)-এর নির্মিত পবিত্র ঘর এবং এর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
এরপর তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। কাবা ধ্বংস না করে বরং তিনি এই ঘরের সম্মান প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন।
এরপরই ঘটে ইতিহাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—তুব্বা রাজা কাবা ঘরের ওপর প্রথম কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত করেন। এটিকেই কাবার প্রথম গিলাফ বা কিসওয়া হিসেবে ধরা হয়।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তিনি প্রথমে ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে কাবাকে ঢেকে দেন। পরে তিনি আরও উন্নত মানের কাপড় ব্যবহার করেন। তার পর থেকেই কাবা ঘরে গিলাফ পরানোর একটি ঐতিহ্য শুরু হয়।
তুব্বা রাজার পর কুরাইশরা কাবার গিলাফ পরিবর্তনের দায়িত্ব নেয়। ইসলাম আগমনের পর এই ঐতিহ্য চালু থাকে। মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়েও কাবায় গিলাফ পরানো হয়েছে। পরবর্তীতে খলিফাগণ, উমাইয়া, আব্বাসীয়, উসমানীয় খেলাফত এবং বর্তমানে সৌদি সরকার প্রতি বছর নতুন গিলাফ পরানোর ব্যবস্থা করে।
বর্তমানে কাবার গিলাফ বিশেষ কারখানায় তৈরি হয় এবং প্রতিবছর হজের সময় এটি পরিবর্তন করা হয়।
তুব্বা রাজা আবু কারিব আস‘আদের কাবায় গিলাফ পরানোর ঘটনা ইসলামী ইতিহাস ও আরব ঐতিহ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই ঘটনাগুলোর কিছু অংশ ঐতিহাসিক তথ্য, আবার কিছু অংশ লোককাহিনী ও ধর্মীয় বর্ণনার সঙ্গে মিশে গেছে।
তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকই একমত যে, কাবা ঘরে কাপড় দিয়ে আচ্ছাদন করার প্রথা ইসলাম-পূর্ব যুগেই শুরু হয়েছিল এবং তুব্বা রাজাকে এর সূচনাকারী হিসেবে ধরা হয়।
আজ কাবার কালো গিলাফ শুধু একটি কাপড় নয়—এটি মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, সম্মান ও ধর্মীয় আবেগের প্রতীক। প্রতি বছর যখন নতুন গিলাফ পরানো হয়, তখন খুব কম মানুষই হয়তো মনে করেন যে, এই ঐতিহ্যের শুরু হয়েছিল শত শত বছর আগে ইয়েমেনের এক রাজাকে দিয়ে।
ইতিহাসের সেই ঘটনাই আজও একটি ধারাবাহিক ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে—কাবা ঘরের গিলাফ, যা বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক।