মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুৎ সেবা এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ছাড়া কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা, এমনকি ঘরোয়া জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই প্রায় অচল। কিন্তু এই অপরিহার্য সেবাই এখন অনেক গ্রাহকের কাছে পরিণত হয়েছে ভোগান্তি, অভিযোগ ও ক্ষোভের আরেক নাম—বিশেষ করে বিল পরিশোধ ব্যবস্থা ও “যুক্ত বিল” জটিলতাকে কেন্দ্র করে।
গ্রাহকদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি মাসের ২২ থেকে ২৪ তারিখের মধ্যে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়। এই সময়সীমা অনেক চাকরিজীবী, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তব আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ অধিকাংশ কর্মজীবী মাসের শেষ সপ্তাহ বা পরবর্তী মাসের শুরুতে বেতন পান। ফলে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিল পরিশোধের চাপ তৈরি হয়, না হলে জরিমানা গুনতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো “জরিমানা দিয়েও রেহাই নেই”। গ্রাহকরা জানান, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে বিল পরিশোধ করলে জরিমানা যুক্ত হয় ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী মাসে আবার সেই বিলের অংশ “বকেয়া” বা “যুক্ত বিল” হিসেবে পুনরায় প্রদর্শিত হয়। এতে গ্রাহকরা বিভ্রান্তির পাশাপাশি আর্থিক চাপেও পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই একই বিল একাধিকবার হিসাবভুক্ত হওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ফলে সমস্যার সমাধান খুঁজতে গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শহরের অফিসে যাতায়াতে সময়, শ্রম ও অর্থ—সবকিছুরই বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, শুধু একটি বিল সংশোধনের জন্য অনেক গ্রাহককে একাধিকবার অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত ভাড়া, কর্মঘণ্টা নষ্ট এবং মানসিক হয়রানিও বাড়ছে।
স্থানীয় গ্রাহক মো. আবদুল কাদের বলেন, “সময়মতো বিল দিতে না পারলে ফাইন দিতে হয়। কিন্তু এরপরও পরের মাসে আবার বকেয়া দেখায়। তখন অফিসে গিয়ে ঠিক করতে হয়। এক কাজের জন্য বারবার ঘুরতে হয়, এতে সময় ও টাকা দুটোই নষ্ট হয়।”
আরেক ভুক্তভোগী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “আমরা চাকরি করি। মাসের শেষে বেতন পাই। কিন্তু বিলের শেষ সময় ২২ বা ২৪ তারিখে। তাই অনেক সময় ধার করে বিল দিতে হয়। না দিলে জরিমানা গুনতে হয়, আবার পরে হিসাবও গড়মিল হয়।”
নারী গ্রাহক রাশেদা বেগম বলেন, “গ্রাম থেকে অফিসে যাওয়া খুব কষ্টের। ভাড়া লাগে, সময় লাগে। ছোট ছোট ভুলের জন্য যদি বারবার অফিসে যেতে হয়, তাহলে সেবা নেওয়ার মানে কী থাকে?”
চাকরিজীবী নারী গ্রাহক পূর্ণিমা রানী দাশ বলেন, “আমরা মাসের শুরুতে বেতন পাই। কিন্তু বিল দিতে হয় বেতন পাওয়ার ১ সপ্তাহ আগে। অনেক সময় টাকা হাতে না থাকায় জরিমানা দিতে হয়। তারপরও পরের মাসে সেই বিল আবার যোগ হয়ে আসে। তখন আবার অফিসে গিয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়।”
গ্রাহকদের পাশাপাশি স্থানীয় সচেতন মহলও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ডিজিটাল যুগে যেখানে বিদ্যুৎ বিল অনলাইনে পরিশোধ করা হচ্ছে, সেখানে প্রতিটি সমস্যার জন্য গ্রাহককে সরাসরি অফিসে গিয়ে সমাধান করতে হওয়া সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এতে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং হিসাব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তারা আরও বলেন, বারবার “যুক্ত বিল” বা বকেয়া দেখানোর ঘটনা গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে। অনেকেই মনে করছেন, সিস্টেমগত ত্রুটি, সফটওয়্যার আপডেট সমস্যা বা হিসাব সংরক্ষণে অসামঞ্জস্যতার কারণেই এই জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে গ্রাহকরা কয়েকটি সুস্পষ্ট দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের সময়সীমা অবশ্যই মাস শেষ হওয়ার পর বাড়ানো উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে বিল দিতে পারে। পাশাপাশি অনলাইন ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি, যাতে ভুল সংশোধনের জন্য অফিসে যেতে না হয়।
এছাড়া “যুক্ত বিল” সমস্যার স্থায়ী সমাধান, হিসাব ব্যবস্থায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি লেনদেন গ্রাহকের মোবাইল বা অনলাইনে তাৎক্ষণিক আপডেট দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সামগ্রিকভাবে গ্রাহকদের অভিমত, বিদ্যুৎ এখন জীবনযাপনের মৌলিক চাহিদা হলেও সেই সেবার ব্যবস্থাপনায় যদি বারবার ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে তা উন্নত সেবা ব্যবস্থার পরিবর্তে দুর্ভোগের ব্যবস্থায় পরিণত হয়। তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান দাবি করেছেন।