নিজস্ব প্রতিবেদক।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
ইসলামের ইতিহাসে পবিত্র কাবাঘর দখলের ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৯৭৯ সালের মক্কা মসজিদুল হারাম দখল বিশ্বের মুসলিম সমাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ‘ইমাম মাহদি’ আবির্ভাবের দাবি, সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং সৌদি রাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান। এরও বহু শতাব্দী আগে, ৯৩০ সালে কারমাতিয়ানদের হামলাও কাবাঘরকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
4
১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর, হিজরি ১৪০০ সনের প্রথম দিন। ফজরের নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত মসজিদুল হারামে হঠাৎ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সালাফি ঘরানার চরমপন্থী নেতা জুহাইমান আল-ওতাইবির নেতৃত্বে প্রায় আড়াইশ সশস্ত্র ব্যক্তি মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা আগে থেকেই জানাজার খাটিয়ার ভেতরে অস্ত্র লুকিয়ে কাবা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিল বলে পরে জানা যায়।
অভিযানের পরপরই দখলকারীরা মসজিদের মাইকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। জুহাইমান ঘোষণা করেন, তার শ্যালক মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-কাহতানিই শেষ যুগের প্রতিশ্রুত ‘ইমাম মাহদি’।
ইসলামী বর্ণনায় মাহদির নাম হবে “মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ”—এই হাদিসের সঙ্গে নামের মিল দেখিয়ে তারা দাবি করে, আল-কাহতানিই সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তি। এরপর উপস্থিত মুসল্লিদের তার হাতে বায়াত গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
জুহাইমান ও তার অনুসারীরা মনে করতেন, সৌদি রাজপরিবার ইসলামের প্রকৃত আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব মুসলিম সমাজকে ধ্বংস করছে। তাদের আন্দোলন মূলত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অসন্তোষের মিশ্র রূপ ছিল।
ঘটনার পর সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী পুরো মক্কা ঘিরে ফেলে। কিন্তু মসজিদুল হারামের মতো পবিত্র স্থানে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানো ছিল অত্যন্ত জটিল সিদ্ধান্ত।
বিদ্রোহীরা মসজিদের মিনার, ভূগর্ভস্থ কক্ষ এবং বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে স্নাইপার হামলা চালাতে থাকে। এতে বহু সেনা ও সাধারণ মুসল্লি নিহত হন।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা অবরোধের পর সৌদি বাহিনী বিশেষ অভিযান শুরু করে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে, অভিযানে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের প্রযুক্তিগত সহায়তাও নেয়া হয়েছিল।
১৯৭৯ সালের ৪ ডিসেম্বর মসজিদুল হারাম পুরোপুরি পুনর্দখল করা হয়। এ সময় তথাকথিত ‘ইমাম মাহদি’ মুহাম্মাদ আল-কাহতানি নিহত হন। পরে জুহাইমান আল-ওতাইবি ও তার প্রধান সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়।
১৯৮০ সালের ৯ জানুয়ারি সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে প্রকাশ্যে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এই ঘটনার পর সৌদি আরবের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা আরও জোরদার করা হয়। টেলিভিশন, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে কড়াকড়ি বাড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের এই ঘটনা সৌদি আরবের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
একই বছর ইরানি বিপ্লবও সংঘটিত হয়েছিল। ফলে পুরো মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক ইসলাম, চরমপন্থা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
কাবাঘর দখল বা আক্রমণের ইতিহাসে আরও ভয়াবহ একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ৯৩০ সালে (হিজরি ৩১৭)।
সে সময় কারমাতিয়ান সম্প্রদায়ের নেতা আবু তাহের আল-জান্নাবি মক্কায় হামলা চালান। হাজিদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে তারা কাবাঘরের পবিত্র ‘হাজরে আসওয়াদ’ খুলে নিয়ে যায়।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, কারমাতিয়ানরা তৎকালীন মূলধারার ইসলামী খেলাফতের বিরোধী ছিল এবং তারা নিজেদের ধর্মীয়-রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল।
হাজরে আসওয়াদ প্রায় ২২ বছর তাদের দখলে ছিল। পরে ৯৫১ সালে সেটি পুনরায় কাবাঘরে ফিরিয়ে আনা হয়।
মক্কার এই দুই ঘটনা মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। ধর্মীয় আবেগ, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং ‘মাহদি’ দাবিকে কেন্দ্র করে কিভাবে ভয়াবহ সহিংসতা তৈরি হতে পারে—তার বড় উদাহরণ হয়ে আছে ১৯৭৯ ও ৯৩০ সালের ঘটনাগুলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামের ইতিহাসে মাহদি সংক্রান্ত বিশ্বাস বহুবার বিভিন্ন গোষ্ঠী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। তবে মূলধারার ইসলামি চিন্তায় এ ধরনের সশস্ত্র বিদ্রোহ ও পবিত্র স্থানে হামলাকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়।