ডেস্ক নিউজ।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় খুলনা অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টি বন্ধ থাকায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে এবং শহর ও গ্রামে বাড়ছে লোডশেডিং।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা অঞ্চলে মোট প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি ঘাটতির কারণে বেশ কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট, ফরিদপুর ৫০ মেগাওয়াট, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির ২২৫ মেগাওয়াট, মধুমতি ১০০ মেগাওয়াট এবং রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র উল্লেখযোগ্য।
এ কারণে প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। খুলনা অঞ্চলে গ্রীষ্ম মৌসুমে দৈনিক চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর মাহফুজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্র চালু রাখা যাচ্ছে না। জ্বালানি পেলেই কেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব।
অন্যদিকে, বিদেশি ঋণ সহায়তায় নির্মিত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকলেও তা পুরো অঞ্চলের চাহিদা মেটাতে পারছে না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলো সীমিত সরবরাহের মধ্যে লোডশেডিং করছে এবং অপচয় কমাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে। এ বিষয়ে ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিরুজ্জামান জানান, চাহিদা সামাল দিতে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সন্ধ্যার পর বন্ধ রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।
এক সংবাদ সম্মেলনে ‘প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম (ফেড)’ জানায়, দেশের এলএনজি আমদানির ৬৮ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। এই রুটে সরবরাহ ব্যাহত হলে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়ে।
সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গ্যাস ও তেলের ঘাটতির কারণে দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে, যা শ্রমবাজারেও চাপ তৈরি করছে।
ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফার্নেস অয়েলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ১৮ টাকার বেশি, যেখানে সৌরবিদ্যুতে তা প্রায় ৯ টাকার কাছাকাছি। এ বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রতিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, টেকসই সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। দেশের কোটি কোটি পরিবারের ছাদ ব্যবহার করে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো নীতিগত পরিবর্তন না আনলে জ্বালানি সংকট ভবিষ্যতে আরও তীব্র হয়ে অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।