মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম)।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
গ্রামবাংলার তৃণমূল প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ। একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কেবল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই নন, তিনি স্থানীয় উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। অথচ সাধারণ জনগণের অনেকেই জানেন না—চেয়ারম্যানের মাধ্যমে কত বিস্তৃত পরিসরের সেবা তাদের জন্য প্রযোজ্য। জনস্বার্থে এই সেবাগুলোর একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা জরুরি।
প্রথমত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বড় একটি অংশ ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, দুস্থ মহিলা সহায়তা, ভিজিডি (VGD), ভিজিএফ (VGF), হতদরিদ্র সহায়তা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির মতো উদ্যোগগুলো সরাসরি অসহায় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনেও চেয়ারম্যানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা), ১০০ দিনের কর্মসূচি, টিআর (TR), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, দরিদ্রদের কর্মসংস্থান প্রকল্প, মৌসুমি কাজের সুযোগ এবং যুব কর্মসংস্থান সহায়তা—এসব কার্যক্রম স্থানীয় বেকার জনগোষ্ঠীর আয়ের পথ তৈরি করে।
তৃতীয়ত, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ইউনিয়ন পরিষদ একটি প্রধান চালিকাশক্তি। রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বাজার ও হাট উন্নয়ন, খাল ও পুকুর খনন, বাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন এবং বিদ্যুৎ সহায়তা—এসব উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করে।
চতুর্থত, পানি, স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক কার্যক্রম। টিউবওয়েল ও গভীর নলকূপ স্থাপন, স্যানিটারি ল্যাট্রিন বিতরণ, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, টিকাদান কর্মসূচি, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ক্যাম্প ও পুষ্টি কর্মসূচি—এসব উদ্যোগ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
পঞ্চমত, শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধিতেও ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্কুল মেরামত, শিক্ষা সহায়তা, উপবৃত্তি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ক্ষমতায়ন, মাদকবিরোধী কার্যক্রম, যুব উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি সচেতন ও সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালানো হয়।
ষষ্ঠত, কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকা উন্নয়নে বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করা হয়। কৃষি প্রশিক্ষণ, বীজ ও সার বিতরণ, সেচ সুবিধা, গাছ লাগানো ও বনায়ন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সহায়তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
সপ্তমত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্রাণ বিতরণ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সহায়তা, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, পুনর্বাসন এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ—এসব কার্যক্রম দুর্যোগকালীন সময়ে মানুষের জীবন রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।
সবশেষে, ডিজিটাল ও প্রশাসনিক সেবাও এখন ইউনিয়ন পর্যায়ে সহজলভ্য। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ প্রদান এবং অনলাইন সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের হাতে থাকা এই বিস্তৃত সেবাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে একটি ইউনিয়নের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ। নাগরিকদের উচিত নিজেদের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে জানা এবং সেবাগুলো সঠিকভাবে পাচ্ছেন কিনা তা নিশ্চিত করা। তবেই তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা পাবে এবং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে।