মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
গ্রামের মাঠজুড়ে এখন বরো ধানের সোনালী সমারোহ। বাতাসে দোল খাওয়া পাকা ধানের শীষ যেন প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যের এক জীবন্ত চিত্র। বছরের এই সময়টিতে সাধারণত কৃষকের ঘরে থাকে আনন্দের আমেজ। দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল ঘরে তোলার ব্যস্ততায় মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি। তবে এবার সেই চিরচেনা হাসি অনেকটাই ম্লান। বাম্পার ফলন হলেও ধানের কম বাজারমূল্যে হতাশা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে কৃষকদের।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা-র পুটিবিলা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পহরচান্দা গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক আবছার উদ্দীন সেই হতাশ কৃষকদেরই একজন। পেশায় তিনি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার স্ত্রীও একই পেশায় কর্মরত। স্বামী-স্ত্রীর উপার্জনে সংসার সচ্ছল হলেও কৃষির প্রতি ভালোবাসা থেকেই প্রতি বছর পৈত্রিক ও বর্গা জমিতে ধান চাষ করে আসছেন তিনি।
চলতি বরো মৌসুমে প্রায় তিন একর জমিতে ধান চাষ করেন আবছার উদ্দীন। অনুকূল আবহাওয়া ও যথাযথ পরিচর্যায় এবার ফলনও হয়েছে বেশ ভালো। তার জমি থেকে প্রায় ৩০০ মণ ধান উৎপাদিত হয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারমূল্য কম হওয়ায় লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষক আবছার উদ্দীন জানান, প্রতি একর জমিতে ধান চাষে খরচ পড়েছে প্রায় ৯০ হাজার টাকা। নিজের জমি ও বর্গাজমি মিলিয়ে চাষাবাদের খরচের তুলনায় প্রতি একরে প্রায় ১৮ হাজার টাকা ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮৪০ টাকায়, যা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে দাবি কৃষকদের।
তিনি আরও জানান, তিন একর জমিতে ধান উৎপাদনে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর মধ্যে রয়েছে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ এবং শ্রমিক খরচ। ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকটের কারণে জনপ্রতি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি গুনতে হচ্ছে প্রায় এক হাজার ৩০০ টাকা। পাশাপাশি শ্রমিকদের থাকা-খাওয়া, চা-নাস্তা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে কৃষকদের।
আক্ষেপ প্রকাশ করে শিক্ষক আবছার উদ্দীন বলেন,“আমার দৈনিক বেতনের দেড় গুণ মজুরি দিয়ে শ্রমিক আনতে হচ্ছে। ধান কাটার খরচ দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু ধানের দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এত কষ্ট করে চাষ করেও যদি ন্যায্যমূল্য না পাই, তাহলে কৃষক কীভাবে টিকে থাকবে?”
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষক মূলধন তুলতেও হিমশিম খাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, ধানের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারিভাবে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় কৃষকের কৃষির প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলার কৃষকই দেশের খাদ্যভাণ্ডারের মূল চালিকাশক্তি। তাই মাঠে সোনালী ধানের হাসি ফিরিয়ে আনতে হলে কৃষকের মুখেও ন্যায্যমূল্যের হাসি ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।