রাকিব হাসান।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
দাদা আপনি নেই আজ দু বছর হলো। কেউ রাখুক আর না রাখুক বাঘারপাড়া প্রেসক্লাবের অন্তত মনে রাখা উচিত ছিলো। আপনাকে নিয়ে আজও একটা স্মরণ সভা পর্যন্ত করতে পারলাম না। বলছিলাম বাবু লক্ষণ চন্দ্র মন্ডলের কথা। আজ যার ২য় মৃত্যুবার্ষিকী। বাঘাররপাড়ার মত একটা পল্লী অঞ্চলে ১৯৮২ সালে স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করতে। বাঘারপাড়ার সীমানা ঘেঁষা খানপুর গ্রাম থেকে এসে এ উপজেলার অন্য চারজন সাংবাদিককে নিয়ে গড়ে তুলেছেন আজকের বাঘারপাড়া প্রেসক্লাব। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব আপনি পালন করেছেন।
লক্ষ্মণ’দা বাঘারপাড়া ও শালিখা উপজেলার মানুষের কাছে সাংবাদিক হিসেবে খুব বেশি পরিচিত ছিলেন।আর ছিলেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও অমায়িক একজন মানুষ। দলমত নির্বিশেষে সবার প্রিয় দাদা।
তিনি বাঘারপাড়া প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম একজন এবং নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। এছাড়া পার্শবর্তী উপজেলা শালিখা প্রেসক্লাবের ও সহসভাপতি ছিলেন। অত্র অঞ্চলের রাজনীতি ,সাহিত্য, সাংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলন সংগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী ও কালের সাক্ষী ছিলেন। গত ১৪ মে তিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন অনন্তলোকে।
লেখক, সাংবাদিক ও কৃষক সংগঠক লক্ষ্মণ চন্দ্র মন্ডল ১৯৬০ সালের ১৮ মে যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের খানপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা অভিলাষ মন্ডল ও মাতা কালীদাসী মন্ডল। পেশা হিসেবে ছাত্র জীবনেই সাংবাদিকতাকে বেছে নেন।সেই সাথে সংবাদপত্রের এজেন্সি ব্যবসার সাথেও জড়িত ছিলেন।
গ্রামের প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে নারিকেলবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। এরপর যশোর সরকারি এম,এম কলেজ থেকে ১৯৭৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যশোর সিটি কলেজে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হন। ১৯৮১ সালে তিনি অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন।ছাত্র অবস্থায় তার লেখা প্রথম গ্রন্থ ‘বিবেকের বাণী’ প্রকাশিত হয়। সেই সাথে সাংবাদিকতা শুরু করেন যশোর থেকে প্রকাশিত সমাচার সমীক্ষা ও সাপ্তাহিক বহ্নি পত্রিকায় । সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন সাহিত্য সাময়িকী পরিক্রমা ,ক্ষণিকা ও উচ্চারণ নামের পত্রিকা। নিজেও কবিতা লেখায় আত্মনিয়োগ করেন এবং বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তার লেখা কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে।
এরপর তিনি যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্ফুলিঙ্গ এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলারবানী পত্রিকার বাঘারপাড়া প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় যথেষ্ট যশ অর্জন করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি সংবাদপত্রের এজেন্টের ব্যবসা শুরু করেন। এর ফলে দেশের বিভিন্ন দৈনিক ,সাপ্তাহিক পত্রিকার সাথে যোগসূত্র তৈরি হয় । দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকা ১৯৯৭ সালে তাকে শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে পুরস্কৃত করে। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই তিনি ওই দৈনিক পত্রিকার আঞ্চলিক প্রতিনিধি হিসেবে শালিখা উপজেলা অফিসে দায়িত্বরত ছিলেন। এছাড়াও দৈনিক বাংলার বানীর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকার বাঘারপাড়া ও শালিখা উপজেলার নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়াও যশোরের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা ‘ গ্রামের কাগজ’ এর প্রতিনিধি হিসাবেও কাজ করেছেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি শালিখার সীমাখালী বাজারে সংবাদপত্রের এজেন্সি ব্যবসার মাধ্যমে বাঘারপাড়া ও শালিখা উপজেলার অসংখ্য পাঠকের কাছে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করছিলেন। তার নিজের রচিত ‘আজকের ছড়া’ ও ‘কবিতালাপ’ গ্রন্থ দুটি পাঠকের কাছে নন্দিত ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
এছাড়াও ১৯৯৯ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসে ‘লতিফ শাহ একজন সোনার মানুষের গল্প ‘ গ্রন্থ টি প্রকাশিত হলে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয় তাকে নিয়ে। এসবের পাশাপাশি ২০০১ সালে যশোরের গাইদঘাটে ‘কৃষি প্রযুক্তিবাস্তবায়ন কেন্দ্র’ নামের একটি কৃষি ও কৃষিকল্যাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এলাকার কৃষকদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ৬৪ টি কৃষি ক্লাব গড়ে তোলেন।
যশোর সদর,বাঘারপাড়া, শালিখা ও কালিগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের সংগঠিত করে এসকল কৃষিক্লাব গড়ে তুলে কৃষি বিজ্ঞানী,কৃষিবিদ ও কৃষকদের নিয়ে কৃষির উন্নয়নে নিবেদিত হয়ে বিশেষকরে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলস কাজ করেছেন।বৃহত্তর যশোর জেলায় বিষ্মুক্ত সবজি উৎপাদনের জন্য কৃষক সংগঠক আইয়ুব হোসেন ও লক্ষ্মণ চন্দ্র মন্ডল কে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ২০১০ সালে পুরস্কৃত করেন.৬৪ টি কৃষি ক্লাবের মনিটরিং সেন্টার গাইদঘাট কৃষি প্রযুক্তি বাস্তবায়ন কেন্দ্র স্থাপনের শুরু থেকেই এর সাধারন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপালন করে গেছেন তিনি নিষ্ঠার সাথে।
করোনাকালীন সময়ে টিকা নিতে আসলে আপনি ফোন দিতেন। বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে প্রেসক্লাবের মিটিংয়ের আগে আপনার সাথে খানপুবাজারে কত মিটিং করেছি। মনে হয় এই তো সেদিন। দেখা হলো কথা হলো। নিশ্চয়ই আবার আবার দরকারে ফোন দিবেন। অথচ আপনি নেই দু বছর।
প্রয়াত সংবাদিক লক্ষ্মণ চন্ড্র মন্ডলের স্বরণে