
।। মোঃ আব্দুল আউয়াল ।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
নির্বাচনে নেই আওয়ামী লীগ। এই বাক্যটি আজ কেবল একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিবরণ নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার এক গভীর সংকটের নাম। এটি এমন একটি মুহূর্ত, যেখানে প্রশ্ন আর কে জিতবে বা কে হারবে—এই সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্নটি আরও গভীরে: এই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র কি এখনও প্রতিযোগিতার নৈতিক কাঠামো হিসেবে টিকে আছে, নাকি তা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে বাছাই করা অংশগ্রহণের এক সীমাবদ্ধ ব্যবস্থায়, যেখানে ক্ষমতার পথে প্রবেশাধিকার নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে, ভোটের ময়দানে নয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ কোনো সাধারণ দল নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক প্রবাহ, একটি রাষ্ট্রগঠনের বয়ান, একটি স্মৃতি ও উত্তরাধিকারের নাম। এই উত্তরাধিকার বিতর্কিত হতে পারে, সমালোচিত হতে পারে, এমনকি দায়বদ্ধতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতেও পারে। কিন্তু ইতিহাসকে উপেক্ষা করে তাকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া মানে শুধু একটি দলকে নয়, রাষ্ট্রের দীর্ঘ স্মৃতিকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া। এতে নির্বাচন কেবল সমসাময়িক ক্ষমতার লড়াই থাকে না; তা হয়ে ওঠে ইতিহাসবিচ্ছিন্ন এক প্রযুক্তিগত আয়োজন।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি তার নৈতিক কাঠামোতে। সেখানে রাষ্ট্র বলে দেয় না কে বৈধ প্রতিযোগী আর কে নয়; রাষ্ট্র কেবল একটি সমতল মাঠ তৈরি করে, যেখানে জনগণ সিদ্ধান্ত নেয়। যখন সেই মাঠ সংকুচিত হয়, যখন কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাইরে চলে যায়, তখন গণতন্ত্র তার আত্মিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে। তখন নির্বাচন আর জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রতীক থাকে না; তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অনুমোদিত প্রতিযোগিতার একটি সীমিত সংস্করণ।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সংকটটি প্রতিনিধিত্বের। লক্ষ লক্ষ মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়, রাজনৈতিক আস্থা ও রাজনৈতিক স্মৃতি একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে যুক্ত। সেই দল নির্বাচন থেকে বাইরে মানে সেই জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় দুর্বল হয়ে পড়া। এটি নিছক দলীয় ক্ষতি নয়; এটি সামাজিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষয়। গণতন্ত্র তখন আর কেবল সংখ্যার সমীকরণ থাকে না; তা হয়ে ওঠে কণ্ঠস্বরের শ্রেণিবিন্যাস—কে বলবে, আর কে বলার সুযোগ পাবে না।
এখানে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে। দায়বদ্ধতা জরুরি, বিচার জরুরি, সংস্কার জরুরি। কিন্তু দায়বদ্ধতার নামে যদি প্রতিযোগিতার অধিকারই সংকুচিত হয়, তবে সেই প্রক্রিয়া ন্যায়বিচারের চেয়ে রাজনৈতিক বাছাইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ন্যায়বিচার ব্যক্তি ও অপরাধের ভিত্তিতে হয়; গণতান্ত্রিক বর্জন হয় সমষ্টিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে। এই দুইয়ের পার্থক্য না করলে রাষ্ট্র ন্যায়বিচারের ভাষায় এক ধরনের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে বৈধতা দেয়।
বাংলাদেশের রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে সংঘাতপ্রবণ। কিন্তু সেই সংঘাতের মধ্যেও একটি মৌলিক নীতি ছিল—ক্ষমতার শেষ ফয়সালা হবে ভোটে। এই নীতি ভেঙে গেলে রাজনীতি নতুন এক পথে হাঁটে, যেখানে প্রতিযোগিতা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে কে মাঠে থাকবে আর কে থাকবে না। এই পথ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে আরও অনিশ্চিত, আরও মেরুকৃত এবং আরও প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তোলে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে যে সরকারই গঠিত হোক, তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বৈধতার প্রশ্ন। শক্তিশালী রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতায় তৈরি হয় না; শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি হয় জনগণের নৈতিক সম্মতিতে। যখন একটি বড় রাজনৈতিক অংশ নিজেকে প্রক্রিয়ার বাইরে মনে করে, তখন সেই সম্মতি দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল সম্মতির ওপর দাঁড়ানো সরকার হয় অতিরিক্ত আপসের পথে যায়, নয়তো অতিরিক্ত কঠোরতার পথে। দুই ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরও গভীর একটি বিপদের কথাও এখানে বলা প্রয়োজন। আজ যদি একটি বড় দল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নির্বাচনের বাইরে থাকে, তবে আগামী দিনে এই নজির অন্যদের জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে। গণতন্ত্র তখন আর স্থায়ী নিয়ম থাকে না; তা হয়ে ওঠে সাময়িক অনুমতির বিষয়। এতে রাজনীতির চরিত্র বদলে যায়। প্রতিযোগিতার রাজনীতি রূপ নেয় অনুমোদনের রাজনীতিতে। আর অনুমোদনের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে আরও ত্বরান্বিত করে।
এই প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, তা কি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির স্বপ্ন, নাকি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের স্বপ্ন? যদি নতুন বন্দোবস্তও পুরনো বর্জনের ভাষা ব্যবহার করে, তবে সেই পরিবর্তন প্রকৃত পরিবর্তন থাকে না; তা কেবল ক্ষমতার রঙ বদলানো হয়। এতে হতাশা আরও গভীর হয়, রাজনৈতিক আস্থার ভাঙন আরও বিস্তৃত হয়।
সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এই পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। ইতিহাসে যারা নিজেদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আশ্রয় একটি নির্দিষ্ট ধারার রাজনীতিতে খুঁজে পেয়েছে, তারা নতুন বাস্তবতায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। গণতন্ত্র যখন অন্তর্ভুক্তির বদলে বর্জনের ভাষা শেখে, তখন সমাজের দুর্বল অংশগুলোই প্রথম সেই বর্জনের চাপ অনুভব করে।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি একটি দার্শনিক ও নৈতিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষা দেখাবে—বাংলাদেশ কি গণতন্ত্রকে একটি স্থায়ী নীতি হিসেবে ধারণ করবে, নাকি একে পরিস্থিতিভেদে প্রয়োগযোগ্য একটি যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। এই পরীক্ষায় ব্যর্থতা মানে কেবল একটি নির্বাচনের ব্যর্থতা নয়; তা মানে রাষ্ট্রচিন্তার একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সূচনা।
কারণ গণতন্ত্রের আসল শক্তি কোনো একক দলের উপস্থিতিতে নয়। গণতন্ত্রের শক্তি এই নিশ্চয়তায় যে—সব বড় রাজনৈতিক শক্তি, সব গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শ, সব প্রধান সামাজিক প্রবাহ নির্বাচনের মাঠে জায়গা পাবে। সেই নিশ্চয়তা যখন ভেঙে যায়, তখন গণতন্ত্র কাগজে টিকে থাকে, বাস্তবে নয়।
নির্বাচনে নেই আওয়ামী লীগ—এই বাক্যটি তাই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে গভীর ও অস্বস্তিকর প্রতীক। এটি প্রশ্ন তোলে শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও। এই ভবিষ্যৎ কি হবে অন্তর্ভুক্তির, না কি বর্জনের? প্রতিযোগিতার, না কি অনুমোদনের? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশের গণতন্ত্র একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াবে, নাকি ধীরে ধীরে এক সংকুচিত রাজনৈতিক পরিসরে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে।