
-মোঃ আব্দুল আউয়াল।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানেই একটি অদৃশ্য উত্তরাধিকার বয়ে বেড়ানো। এই উত্তরাধিকার কোনো স্থাবর সম্পত্তির নয়, বরং এটি দৃষ্টিভঙ্গির। এ দেশে পা রাখলে বা এখানকার আলো-বাতাসে বড় হলে আপনি তিনটি জিনিস অবধারিতভাবে বিনামূল্যে পাবেন: উপদেশ, বিশ্লেষণ আর কনস্পিরেসি থিওরি বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এই তিনটি উপাদান আমাদের জাতীয় ডিএনএ-র সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, আমরা চাইলেও এগুলো থেকে মুক্তি পাই না। ছোটবেলা থেকে আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এক অদ্ভুত বাইনারি লজিক। আমাদের শেখানো হয় পৃথিবীটা সাদা-কালো, এর মাঝে ধূসর কোনো রঙের অস্তিত্ব নেই। আমাদের খুব যত্ন করে শেখানো হয় কাকে ঘৃণা করতে হবে, কাকে পরম আতঙ্কে সন্দেহ করতে হবে আর কাকে অন্ধভাবে সমর্থন করতে হবে। এই ‘অন্ধ সমর্থন’ আর ‘পরম ঘৃণা’র মাঝখানে যে সুস্থ চিন্তার একটি বিস্তীর্ণ প্রান্তর থাকতে পারে, সেই শিক্ষাটা আমাদের পারিবারিক বা সামাজিক কাঠামোতে একদম অনুপস্থিত। ফলে আমরা যখন বড় হই, আমরা আসলে একেকজন নাগরিক হিসেবে নয়, বরং একেকটি আদর্শিক বা গোত্রীয় সৈনিক হিসেবে বড় হই। আমাদের নিজস্ব কোনো চোখ থাকে না, আমরা দেখি আমাদের প্রিয় দলের বা গোষ্ঠীর চশমা দিয়ে।
এই সমাজে নিরপেক্ষতা বা যৌক্তিক অবস্থান নেওয়াটা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। আপনি যদি কোনো পক্ষ না নেন, যদি বস্তুনিষ্ঠভাবে সত্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন, তবে আপনি হয়ে পড়বেন সবচেয়ে বড় সন্দেহভাজন। এ দেশে ‘নিরপেক্ষ’ মানুষের কোনো জায়গা নেই। আপনি যদি আজ ক্ষমতায় থাকা দলের ভুল ধরেন, তবে আপনি অবধারিতভাবে বিরোধী পক্ষের এজেন্ট। আবার যদি আপনি দেশের কোনো উন্নয়ন বা ভালো কাজের প্রশংসা করেন, তবে আপনি চামচামির দায়ে দুষ্ট। আপনার ব্যক্তিগত সত্তার চেয়ে আপনার ওপর লেপ্টে দেওয়া ট্যাগ বা লেবেলটা এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে আপনি যদি একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করেন, তবে আপনাকে সহজেই ‘লীগ’ তকমা দিয়ে দেওয়া হবে। আবার কয়েক বছর আগে চিত্রটা ছিল ভিন্ন, তখন একটু প্রশ্ন করলেই কপালে জুটে যেত ‘শিবির’ তকমা। আমাদের সমাজ মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখেনি, দেখেছে ছাঁচে ঢালা একেকটি রাজনৈতিক পরিচয়ে। এর ফলে যা হয়েছে তা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব। আমরা এখন আর তথ্য বা যুক্তি দিয়ে বিচার করি না, আমরা বিচার করি বক্তার পরিচয় দিয়ে। বক্তা যদি আমার প্রিয় দলের হয়, তবে তার ডাহা মিথ্যাও আমার কাছে ঐশী বাণীর মতো পবিত্র। আর বক্তা যদি আমার অপছন্দের দলের হয়, তবে তার পরম সত্যটাও আমার কাছে গভীর চক্রান্ত মনে হয়।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আপনি যদি খুব সরলভাবে বলেন যে আকাশটা আজ নীল, তবে দেখবেন চারপাশ থেকে দশজন লোক তেড়ে আসবে এটা প্রমাণ করতে যে, এই নীল আকাশের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর আন্তর্জাতিক চক্রান্ত আছে। হয়তো কোনো পরাশক্তি আকাশকে নীল রাখার জন্য রাসায়নিক ছিটিয়েছে, কিংবা কোনো গোপন গোষ্ঠী আমাদের দৃষ্টি বিভ্রম ঘটাচ্ছে। আমরা সাধারণ ঘটনাকে সাধারণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটা অদৃশ্য হাত খোঁজা আমাদের মজ্জাগত স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতি আমাদের এই অগাধ বিশ্বাস আসলে আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার একটি ঢাল। আমরা যখন কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারি না, তখন আমরা বলি এর পেছনে বিদেশের হাত আছে। আমরা যখন নিজেরা দুর্নীতি করি, তখন বলি সিস্টেম আমাদের বাধ্য করছে। এই যে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি, এটা আমাদের নৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
ক্ষমতা আমাদের দেশে এক অদ্ভুত পরশপাথর। যে ক্ষমতায় থাকে, সে আমাদের চোখে ভিলেন। আমরা মনে করি, ক্ষমতায় আছে মানেই সে চোর, সে লুটেরা, সে অত্যাচারী। আর যে ক্ষমতার বাইরে আছে, তাকে আমরা ফেরেশতা জ্ঞান করি। আমরা ভাবি, এই মানুষটি বা এই দলটি ক্ষমতায় এলেই বুঝি দেশটা জান্নাত হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস বারবার আমাদের নিষ্ঠুর শিক্ষা দিয়েছে। ক্ষমতার বাইরের ফেরেশতারা যখনই সিংহাসনে বসেন, তারা ধীরে ধীরে রক্ত-মাংসের মানুষে পরিণত হন। মানুষের সব দোষ-ত্রুটি, লোভ-লালসা তাদের গ্রাস করে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাদের আর চেনা যায় না। অথচ আমরা বারবার একই ভুল করি। আমরা প্রতিবার একজন নতুন ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় থাকি, এবং প্রতিবারই হতাশ হই। আমাদের এই হিরো-ওয়ারশিপ বা ব্যক্তিপূজার প্রবণতা আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তিকে বড় করে দেখি, আর সেই ব্যক্তি যখন ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যান, তখন আমরা আবার নতুন কোনো দেবদূতের স্বপ্নে বিভোর হই।
স্বজনপ্রীতি নিয়ে আমাদের অবস্থান সবচেয়ে হাস্যকর। আমরা যখন অন্যের দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতি দেখি, তখন আমাদের ধমনীতে ন্যায়বিচারের রক্ত টগবগ করে ফোটে। আমরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই, চায়ের কাপে ঝড় তুলি। কিন্তু যখন সেই একই সুযোগ আমার নিজের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন আমাদের সুর পাল্টে যায়। তখন আমরা একে বলি ‘বাস্তবতা’। আমরা বলি, ‘সিস্টেমটাই তো এমন, আমি একা ভালো থেকে কী করব?’ কিংবা বলি, ‘নিজের মানুষকে একটু সুবিধা দেওয়া তো মানবিকতা।’ এই যে দ্বিমুখী নীতি, এটা আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। আমরা আসলে অন্যায়কে ঘৃণা করি না, আমরা ঘৃণা করি অন্যায়ের সুবিধাটা নিজে না পাওয়াকে। আমরা যদি সুযোগ পাই, তবে আমরাও সেই একই কাজ করি যা আমরা অন্যের ক্ষেত্রে ঘৃণাভরে সমালোচনা করি। এই চারিত্রিক দ্বিচারিতা আমাদের একটি ভণ্ড জাতি হিসেবে গড়ে তুলছে।
জীবনটা আসলে খুবই সংক্ষিপ্ত। আজ আমরা যে দম্ভ নিয়ে চলছি, কাল হয়তো তার কিছুই থাকবে না। আজ আপনি বা আমি মারা গেলে ফেসবুকে বড়জোর দুদিন কান্নাকাটির ঝড় উঠবে। মানুষ সুন্দর সুন্দর শোকবার্তায় কমেন্ট বক্স ভরিয়ে দেবে। কেউ হয়তো আপনার সাথে কাটানো একটি পুরনো ছবি শেয়ার দিয়ে লম্বা ক্যাপশন লিখবে। কিন্তু তিন দিনের মাথায় জীবন তার নিজস্ব গতিতে ফিরে যাবে। আপনার শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যাবে অফিসের ডেস্কে, পরিবারের আড্ডায় বা বন্ধুদের আড্ডায়। এই যে ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব, তারপরও আমাদের ভেতরে এত ঘৃণা কেন? কেন আমরা একে অপরের রক্ত পিয়াসী হয়ে উঠি? সামান্য রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা আদর্শিক অমিলের কারণে আমরা একে অপরকে মুছে দিতে চাই। আমরা ভুলে যাই যে, দিনশেষে আমরা সবাই একই মাটির
মানুষ, একই আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা একদল পথিক যারা খুব অল্প সময়ের জন্য এই স্টেশনে থেমেছি।
ঘৃণা কোনো সমস্যার সমাধান দেয় না, বরং এটি ঘৃণা উৎপাদনকারী ব্যক্তিকেই ভেতর থেকে পুড়িয়ে মারে। আমরা যখন কাউকে ঘৃণা করি, তখন আমরা আসলে নিজেদেরই ক্ষতি করি। আমাদের এই ছোট ভূখণ্ডে যেখানে এমনিতেই মানুষের ভিড়, সেখানে একে অপরকে সহ্য করতে না পারাটা একটা বড় ট্র্যাজেডি। আমরা যদি একে অপরকে সন্দেহ করার বদলে একটু বোঝার চেষ্টা করতাম, যদি অন্ধ সমর্থনের বদলে যৌক্তিক সমালোচনা করতাম, তবে হয়তো এই সমাজটা অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু আমরা বেছে নিয়েছি বিভাজনের পথ। আমরা দেয়ালে দেয়াল তুলছি, অথচ আমাদের দরকার ছিল সেতু তৈরি করা।
বাংলাদেশে জন্ম নিলে আপনাকে যে ঘৃণা করতে শেখানো হয়, সেই পাঠশালা থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সবখানেই কোনো না কোনো পক্ষ নেওয়ার চাপ থাকে। আপনাকে বলা হবে, ‘ওরা খারাপ, আমরা ভালো।’ এই ‘ওরা’ আর ‘আমরা’র বিভাজনই আমাদের সব সমস্যার মূল। আমরা মানুষ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার আগে নিজেদের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করি। এর ফলে আমাদের মানবিক সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষ যখন অন্য একজন মানুষের বিপদ দেখে তার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চায়, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজ মানসিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে।
আমরা যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন কি আমরা নিজেদের সেই আসল চেহারাটা দেখতে পাই? নাকি আমরা সেই মাস্কটা দেখি যা আমরা সমাজের জন্য পরে থাকি? আমাদের এই অন্তহীন কনস্পিরেসি থিওরি, এই নিরন্তর কাদা ছোঁড়াছুড়ি—এসবের শেষ কোথায়? হয়তো কোনো শেষ নেই। হয়তো আমরা এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই বিষ বয়ে নিয়ে যাব। কিন্তু মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত লাগে। মনে হয়, ইস! যদি একবারের জন্যও আমরা সব ভুলে শুধু মানুষ হতে পারতাম। যদি ক্ষমতা আর রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আমরা একে অপরের হাত ধরতে পারতাম।
দিনশেষে আমরা সবাই একা। আমাদের এই ঘৃণা, আমাদের এই আস্ফালন সবই ধুলোয় মিশে যাবে। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় সাম্রাজ্য টিকে থাকেনি, আর আমরা তো সামান্য মানুষ। তারপরও কেন আমরা এত অহংকার করি? কেন আমরা সিস্টেমের দোহাই দিয়ে নিজেদের পচে যাওয়া বিবেককে প্রশ্রয় দিই? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো আমাদের জানা, কিন্তু আমরা সেগুলো ফেস করতে ভয় পাই। কারণ উত্তরগুলো জানলে আমাদের নিজেদের ওপর থেকেই বিশ্বাস হারিয়ে যাবে। আমরা এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে বাস করছি। এই ঘোর কাটাতে হলে আমাদের নিজেদের আয়নায় নিজেদের দেখা শিখতে হবে। অন্যের ভুল ধরার আগে নিজের ভেতরের সেই ‘ফেরেশতা’ আর ‘শয়তান’কে চিনতে হবে। তবেই হয়তো কোনো একদিন এই উপদেশ, বিশ্লেষণ আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দেশ থেকে বেরিয়ে আমরা সত্যিকারের এক ভালোবাসার দেশ গড়তে পারব। যেখানে মানুষ মানুষকে সন্দেহ করবে না, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মনুষ্যত্ব বড় হবে, আর যেখানে অন্তত আকাশ নীল দেখলে কেউ তাকে চক্রান্ত বলবে না।