সাকিব আহসান
প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন খামারের আড়ালে খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ খামার। ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে সারি সারি ঝুলন্ত খাঁচা। কোথাও শালিক, কোথাও টিয়া, কোথাও দোয়েল কিংবা ছোট আকারের রঙিন পাখি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব পাখির বেশিরভাগই আশপাশের গ্রাম ও ফসলি জমি থেকে ধরে আনা হয়েছে।
অনেকের কাছে এটি শখ, কারও কাছে বাড়তি আয়ের পথ। কিন্তু আইন বলছে এটি সরাসরি অপরাধ। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, সরকার বা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো বন্য পাখি ধরা, আটক, দখল বা হেফাজতে রাখা যাবে না। আইনের ধারা ৬ স্পষ্টভাবে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অর্থাৎ শখের বসে হলেও পাখি খাঁচায় রাখা আইনের দৃষ্টিতে “আটক ও দখল”।
ধারা ১২ আরও কঠোর। এতে বলা হয়েছে, বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিড়িয়াখানা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা অনুমোদিত রেসকিউ সেন্টার ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বন্যপ্রাণী আবদ্ধ অবস্থায় পালন করতে পারবে না। সাধারণ নাগরিকের বাড়ি, দোকান কিংবা খামারে পাখি লালন-পালনের কোনো বৈধ সুযোগ নেই।
আইনের তফসিল অনুযায়ী সংরক্ষিত পাখি খাঁচায় রাখলে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়ে। ধারা ৩৫ ও ৩৬ অনুসারে, তফসিল-১ ভুক্ত পাখি আটক বা দখলে রাখার অপরাধে ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। অন্যান্য তফসিলভুক্ত পাখির ক্ষেত্রেও ৬ মাস থেকে ২ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হতে পারে। শুধু পাখি রাখাই নয়,ধারা ৩৯ অনুযায়ী পাখি ধরা, কেনাবেচা, পরিবহন কিংবা খাঁচা সরবরাহ করাও সমানভাবে দণ্ডনীয়।
স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “খামারের ভেতরে যে পাখিগুলো আছে, সেগুলো অনেক সময় ভোরে জাল পেতে ধরা হয়। পরে খাঁচায় তুলে বিক্রির জন্য রাখা হয়।” আরেকজন বলেন, “শিশুরা খুশি হয় বলে অনেকেই পাখি কিনে আনেন। কিন্তু আমরা জানতাম না এটি এত বড় আইনগত অপরাধ।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাখি শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়; তারা বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, বীজ ছড়ানো, পরাগায়ন সব ক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা রয়েছে। একটি এলাকায় পাখির সংখ্যা কমে গেলে কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশগত ভারসাম্যেও প্রভাব পড়ে। খাঁচায় বন্দি অবস্থায় পাখির স্বাভাবিক আচরণ, খাদ্যাভ্যাস ও প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। দীর্ঘদিন আবদ্ধ থাকলে অনেক পাখিই অসুস্থ হয়ে পড়ে বা মারা যায়।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ ও বন বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, “অনুমতি ছাড়া কোনো বন্য পাখি পালন বৈধ নয়। অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।” তবে স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত নজরদারি না থাকায় এমন কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।
প্রশ্ন হচ্ছে,শখ কি আইনের ঊর্ধ্বে? একটি শিশুর সাময়িক আনন্দের জন্য যদি প্রকৃতির একটি প্রাণীকে তার স্বাভাবিক আবাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, সেটি কি গ্রহণযোগ্য? আইন শুধু শাস্তির জন্য নয়; এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষার সামাজিক অঙ্গীকার।
পীরগঞ্জের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, সচেতনতা ও প্রয়োগ দুটিই জরুরি। প্রশাসনের সক্রিয়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি দরকার জনমনে মানসিক পরিবর্তন। খাঁচার রঙিন সৌন্দর্যের চেয়ে মুক্ত আকাশে উড়ন্ত পাখিই প্রকৃত সৌন্দর্য। প্রকৃতিকে বন্দি না করে তাকে তার স্বাভাবিক পরিবেশে বাঁচতে দেওয়া এটাই হোক আমাদের শখের নতুনত্ব।