শাইখ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল❞ আল মাদানী (হাফিঃ)।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত হলো যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা। রমজানের সিয়াম পালনের ভুল-ত্রুটি বিমোচন এবং অভাবীদের মুখে হাসি ফোটানোই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফিতরা টাকা দিয়ে আদায় করা নিয়ে একদল ‘রায়পন্থী’ বা যুক্তিপ্রদানকারী নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অথচ শরীয়তের অকাট্য দলিল ও মূলনীতি অনুযায়ী টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় সুন্নাহর পরিপন্থী। কেন টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা যাবে না, সে বিষয়ে ১০টি মৌলিক কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
যেকোনো ইবাদত কবুলের দুটি শর্ত: ইখলাস এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পদ্ধতি অনুসরণ। রাসূল (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণ আজীবন খাদ্যদ্রব্য দিয়েই ফিতরা দিয়েছেন। আন্তরিকতা থাকলেও রাসূলের পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ইবাদত করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে (সহীহ বুখারী, হা/৭১৩৭)।
ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির স্থান নেই। শরীয়তপ্রণেতা কর্তৃক অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায়ের বিষয়টি সাব্যস্ত হয়নি। রাসূল (ﷺ) যা যেভাবে শিখিয়েছেন, তা সেভাবেই পালন করা ফরজ। (সুনানুল বায়হাকী, হা/১৩২২১)।
রাসূল (ﷺ)-এর পর খোলাফায়ে রাশেদীন বা সাহাবীদের কেউ টাকা দিয়ে ফিতরা দেননি। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মূলনীতি হলো দ্বন্দ্ব নিরসনে কিতাব ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া। টাকা দিয়ে ফিতরা দেওয়ার কোনো প্রমাণ কুরআন, হাদীস বা সাহাবীদের আমলে নেই।
অনেকে দাবি করেন তখন ছোট মুদ্রা ছিল না, তাই খাদ্য দেওয়া হতো। এটি ডাহা মিথ্যা। রাসূল (ﷺ)-এর যুগে দিনার, দিরহাম ছাড়াও ‘কীরাত’ ও ‘দানেক’-এর মতো ছোট মুদ্রার প্রচলন ছিল (সহীহ বুখারী, হা/২২৬২)। অভাবী মানুষও ছিল, মুদ্রাও ছিল—তবুও রাসূল (ﷺ) খাদ্যই দিয়েছেন।
কুরআনে ফিদইয়া বা কাফফারার ক্ষেত্রে ‘ত্বআম’ বা খাদ্য প্রদানের নির্দেশ এসেছে (সূরা বাকারা: ১৮৪)। যাকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রেও হাদীসে ‘ত্বআম’ শব্দ এসেছে। খাদ্যের বদলে টাকা দিলে তা আর ‘ত্বআম’ থাকে না।
হাদীসে ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সা’ (এক প্রকার ওজন) দিয়ে। ‘সা’ কেবল খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে হয়, টাকার ক্ষেত্রে নয়। রাসূল (ﷺ) যদি মূল্য বোঝাতে চাইতেন, তবে বিভিন্ন খাদ্যের সমমূল্য নির্ধারণ করতেন, কিন্তু তিনি সব খাদ্যের জন্যই ‘এক সা’ নির্দিষ্ট করেছেন।
যদি ফিতরা টাকা দিয়ে দেওয়া জায়েজ হয়, তবে কুরবানীর বদলে টাকা সদকা করা কেন জায়েজ হবে না? ইমাম ইবনে তায়মিয়াহর মতে, কুরবানীর বদলে মূল্য সদকা করা মুহাম্মাদী শরীয়তের প্রকাশ্য বিরোধিতা। ফিতরার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
অনেকে মনে করেন শুধু হাদীসে বর্ণিত ৫টি খাদ্যই দিতে হবে। এটি ভুল। রাসূল (ﷺ) মূলত ‘ত্বআম’ বা খাদ্যের কথা বলেছেন (সুনানে নাসাঈ, হা/২৫১০)। সাহাবীদের যুগে মদিনার প্রধান খাদ্য ছিল যব, খেজুর ইত্যাদি। বর্তমানে আমাদের দেশে চাল প্রধান খাদ্য হওয়ায় চাল দিয়ে ফিতরা দেওয়াই সুন্নাহসম্মত।
টাকা দিয়ে ফিতরা দেওয়ার প্রথা চালু করলে রাসূল (ﷺ)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ (খাদ্য প্রদান) সমাজ থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ইবাদতের ধরনে পরিবর্তন আনা সরাসরি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।
যাকাতুল ফিতর হলো ‘মিসকিনদের খাদ্য’ (তু’মাতুল লিল মাসাকিন)। এটি কেবল তাদের পেট ভরার জন্য নয়, বরং ইবাদতের অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট বস্তু প্রদান। অভাবীদের টাকার প্রয়োজন থাকলে তা সাধারণ যাকাত বা সাদকা থেকে মেটানো সম্ভব।
রাসূল (ﷺ)-এর স্পষ্ট সুন্নাহ বিদ্যমান থাকতে কোনো ইমামের ব্যক্তিগত ইজতিহাদ বা কিয়াস গ্রহণ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নিজেই বলে গেছেন, “সহীহ হাদীসই আমার মাযহাব।” সুতরাং মাযহাব টিকিয়ে রাখার দোহাই দিয়ে সুন্নাহর সরাসরি বিরোধিতা করা বর্জনীয়।
উপসংহার: ফিতরা কোনো সাধারণ দান নয়, এটি একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদত। সুতরাং সংশয়মুক্ত থাকতে এবং সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণে খাদ্যদ্রব্য (যেমন: চাল) দিয়েই ফিতরা আদায় করুন।
(পরিমার্জন করা)