— মো: আব্দুল আউয়াল।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বিংশ শসতাব্দীর ষাটের দশকে কবি আহসান হাবিব যখন তাঁর ‘ছায়াহরিণ’ কাব্যগ্রন্থে ‘গজব’ কবিতাটি লিখেছিলেন, তখন সম্ভবত তিনি এক চিরকালীন ও বৈশ্বিক সত্যকেই রূপক হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। কবিতার সেই অমোঘ পঙক্তি— ‘কোথায় লড়াই হয় রাজায় রাজায়, ঘরের সারাই মোর খালি হয়ে যায়’—আজকের একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসেও ইরান তথা সমগ্র মধ্য প্রাচ্যের আকাশে-বাতাসে এক মর্মান্তিক সত্য হয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কবিতার যে ‘উজ্জ্বত আলী সরদার’ পুত্রশোকে একা বসে থেকে একে ‘গজব’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, আজকের তেহরান থেকে বৈরুত, কিংবা গাজা থেকে তেল আবিব—সর্বত্রই অগণিত উজ্জ্বত আলী সরদারদের হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছে।
বর্তমান ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, বরং এটি মানবতার এক চরম সংকটের নাম। যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নেশায় মত্ত হয়, তখন সাধারণ মানুষের ঘর-সংসার যে কীভাবে ছারখার হয়ে যায়, আহসান হাবিবের কবিতা যেন তার এক আগাম মহাকাব্যিক বয়ান। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সংঘাত নয়, বরং এটি এক জটিল গোলকধাঁধা। একদিকে দীর্ঘদিনের ছায়া যুদ্ধ এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে এর সাথে জড়িয়ে গেছে বিশ্বরাজনীতির বড় বড় শক্তিগুলো। আধুনিক মারণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক মিসাইল আর ড্রোনের এই যুগে রাজায় রাজায় লড়াইয়ের ধরন বদলেছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের ‘ঘরের সারাই’ খালি হওয়ার ইতিহাস বদলায়নি। কবির ভাষায় ‘গজব তো আর আসমান থেকে পড়ে না, গজব তো মানুষই আনে মানুষের ঘরে’—এই পঙক্তিটি বর্তমানে ইরানের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মনের কথা। আসমান থেকে কোনো দৈব দুর্যোগ নেমে আসেনি, বরং মানুষের তৈরি বারুদ আর ঘৃণার আগুনে আকাশ লাল হয়ে উঠছে।
এই যে কৃত্রিম বিপর্যয়, একেই কবি আহসান হাবিব মানুষের আনা ‘গজব’ বলে চিহ্নিত করেছেন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং সংঘাতের দামামা সেখানকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আহসান হাবিবের কবিতায় যেমন মোড়লের সোনার সংসার ছারখার হওয়ার বর্ণনা আছে, তেমনি আজ মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়া জীবনযাত্রা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। যুদ্ধ মানে কেবল সীমান্তের সংঘাত নয়, যুদ্ধ মানে ডাল-ভাতের সংস্থান ফুরিয়ে যাওয়া, যুদ্ধ মানে সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়া। কবিতার সেই ‘একমাত্র পুঁত গেল মা জননী গেল’—এই হাহাকার আজ প্রতিটি যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের সাধারণ সত্য। যখন আকাশসীমায় যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যায়, তখন প্রান্তিক মানুষগুলো জানে না কালকের সূর্যোদয় তারা দেখতে পাবে কি না। এটিই আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরিহাস। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন আদর্শিক লড়াই বা ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের কথা বলে, তখন তারা সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্বপ্নগুলোর কথা ভুলে যায়। এই ‘জ্বালা’ হলো যুদ্ধের আগুনের জ্বালা, প্রিয়জন হারানোর জ্বালা। কবিতার চরিত্র ‘উজ্জ্বত আলী সরদার’ পুত্রশোকে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন, ঠিক তেমনি আজ কত পিতা তাদের সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে বসে আছেন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান বিশ্ববিবেকের কাছে নেই।
বিশ্বায়নের এই যুগে মধ্যপ্রাচ্যের এই দহন কেবল ওই অঞ্চলের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, এর আঁচ সুদূর বাংলাদেশ পর্যন্ত এসে পৌঁছানো এক রূঢ় বাস্তবতা। আহসান হাবিবের কবিতার সেই ‘ঘরের সারাই খালি হয়ে যাওয়া’র সুর আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যদি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে তার প্রথম আঘাত আসবে জ্বালানি তেলের বাজারে। বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদায় সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের ফলে যদি নৌপথ বন্ধ হয়ে যায় বা তেল উৎপাদন ব্যাহত হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের পরিবহন খাত, কৃষি এবং শিল্প উৎপাদনে। যখন ডিজেল বা পেট্রোলের দাম বাড়বে, তখন সাধারণ কৃষকের সেচ খরচ থেকে শুরু করে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। কবির সেই ‘গজব’ তখন বাংলাদেশের প্রতিটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের দোরগোড়ায় এসে কড়া নাড়বে। আসমান থেকে নয়, বরং দূরদেশের বারুদের গন্ধ আমাদের চাল-ডালের ব্যাগে টান ধরিয়ে দেবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের কয়েক মিলিয়ন শ্রমিক কর্মরত আছেন। সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এই বিশাল সংখ্যক প্রবাসীর কর্মসংস্থান চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। কুয়েত যুদ্ধ বা লিবিয়া সংকটের সময় আমরা দেখেছি কীভাবে হাজার হাজার শ্রমিক রিক্তহস্তে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। আহসান হাবিবের কবিতায় যেমন ‘উজ্জ্বত আলী সরদার’ তার সব হারিয়ে একা বসে ছিলেন, তেমনি আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা যদি যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা থেকে কাজ হারিয়ে ফিরে আসেন, তবে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল ধস নামবে। একেকটি প্রবাসীর আয়ের ওপর নির্ভর করে দেশে থাকা একেকটি ‘সোনার সংসার’। যুদ্ধ সেই সংসারগুলোকে ‘ছারখার’ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মুদ্রাস্ফীতির চাপে যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, তখন দেশীয় বাজারেও তার এক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ এক জটিল সমীকরণের সম্মুখীন হবে। এই টানাপোড়েনে কোনো আন্তর্জাতিক মেরুকরণ বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি বাজারে যদি কোনো মন্দা দেখা দেয়, তবে লাখ লাখ শ্রমিকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। কবিতার সেই ‘একমাত্র পুঁত গেল’—এই হাহাকার তখন আমাদের শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের চোখেমুখে ফুটে উঠবে।
খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নেও বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে না। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে সার এবং খাদ্যশস্য আমদানিতে বড় ধরণের সংকট তৈরি হবে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি কীভাবে গমের দাম ও সারের সংকট আমাদের কৃষি ব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সেই একই চিত্র আরও ভয়াবহভাবে ফিরে আসতে পারে। আহসান হাবিবের কবিতায় বর্ণিত ‘মানুষের আনা গজব’ তখন আমাদের কৃষকের হালের বলদ বিক্রি করতে বাধ্য করবে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন মিসাইল ওড়ে, তখন বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মানুষ হয়তো তা টেলিভিশনে দেখে, কিন্তু মাস শেষে যখন তারা বাজারের ফর্দ মেলাতে পারে না, তখন তারা বুঝতে পারে এই যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য তারাও দিচ্ছে। আহসান হাবিবের ‘গজব’ কবিতাটি আজ কেবল ইরানের জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও এক সতর্কবার্তা। ‘রাজায় রাজায় লড়াই’ বা বিশ্বশক্তির দম্ভের মাশুল দিতে হচ্ছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে। যুদ্ধ মানে কেবল মৃত্যু নয়, যুদ্ধ মানে তিলে তিলে গড়া একটি দেশের স্বপ্ন ভঙ্গ হওয়া।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ‘সোনার সংসার’ আজ বিশ্ব রাজনীতির এই অস্থিরতার কাছে জিম্মি। কবি যেভাবে একাকী বসে থেকে এই ধ্বংসলীলাকে ‘গজব’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, আমরাও আজ তেমনি এক অসহায়ত্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব নেতৃত্ব সংঘাতের পথ পরিহার না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভাগ্যাকাশে এই যুদ্ধের কালো মেঘ ‘গজব’ হয়েই ঝুলে থাকবে। আমাদের অর্থনীতি, আমাদের প্রবাসী শ্রমিক এবং আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা—সবই আজ সেই সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের আগুনে দগ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই এই প্রার্থনা আজ সর্বজনীন হওয়া উচিত যেন মানুষের তৈরি এই ‘গজব’ থেকে মুক্তি পায় বিশ্ব, মুক্তি পায় বাংলাদেশ।
আহসান হাবিবের কবিতাটি আমাদের শেখায় যে, যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়, বরং এটি একটি কৃত্রিম অভিশাপ যা মানুষ নিজেরাই ডেকে আনে। এই আয়না আমাদের অপরাধী করে তোলে, আমাদের ভাবিয়ে তোলে এবং শান্তির পথে ফেরার আহ্বান জানায়। কারণ গজব মানুষই আনে, আর মানুষই পারে এই গজব থেকে পৃথিবীকে মুক্তি দিতে।