মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা জুড়ে অবৈধভাবে পাহাড়, টিলা ও ফসলি জমির মাটি কাটার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিভিন্ন সময় অভিযান ও কঠোরতার ঘোষণা থাকলেও রাতের আধারে চলছে মাটি কাটার মহোৎসব। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি শক্তিশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পাহাড় কেটে ট্রাক ও ডাম্পারযোগে বিভিন্ন এলাকায় মাটি বিক্রি করছে।
সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে চরম্বা ইউনিয়ন–এর ৫নং ওয়ার্ডের ফকির পাড়া এলাকায়। একই সঙ্গে কলাউজান ইউনিয়ন ও চুনতি ইউনিয়ন এলাকাতেও টিলা ও পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানান, দিনের বেলা কাজ বন্ধ থাকলেও গভীর রাতে এক্সকাভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে ট্রাকে মাটি বোঝাই করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পাহাড় ও টিলা কেটে মাটি বিক্রির ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে এবং আশপাশের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটিও কেটে বিক্রি করায় কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ মাটি খেকো সিন্ডিকেট স্থানীয়ভাবে প্রভাব খাটিয়ে এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা পাহাড় ও টিলা কেটে প্রতিদিন ট্রাক ও ডাম্পারযোগে হাজার হাজার ঘনফুট মাটি বিক্রি করছে। এসব মাটি মূলত ফসলি জমি ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ ও ইটভাটায় ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে উপজেলা প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এক্সকাভেটর জব্দ, জরিমানা ও মাটি কাটার কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাতে অভিযান চালিয়ে একাধিক এক্সকাভেটর ও মাটি পরিবহনে ব্যবহৃত একাধিক গাড়ি জব্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবুও অভিযানের পর কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবার নতুন করে শুরু হয় মাটি কাটার কার্যক্রম।
পরিবেশবিদরা বলছেন, পরিকল্পনাহীনভাবে পাহাড় ও টিলা কেটে ফেললে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া, ভূমিধস এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।
এদিকে সচেতন মহল মনে করছেন, অবৈধ মাটি বাণিজ্য বন্ধে নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও সচেতন হয়ে পাহাড় ও ফসলি জমি রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের আরও অভিযোগ, অবৈধ মাটি বাণিজ্য বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তির রহস্যজনক নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাদের দাবি, ইউনিয়ন পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা সহায়তায় নিয়োজিত দফাদার ও চৌকিদাররা প্রশাসনের ‘চোখ-কান’ হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তারা মাটি বোঝাই ট্রাক বা ডাম্পার আটকানো কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করার দায়িত্ব পালন করছেন না। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে মাটি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে রাতের আধারে নির্বিঘ্নে মাটি কেটে পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে। সচেতন মহল মনে করেন, স্থানীয় চৌকিদার ও দফাদাররা যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করতেন এবং প্রশাসনকে দ্রুত তথ্য দিতেন, তবে মাটি খেকোদের অনেক আগেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হতো এবং পরিবেশবিধ্বংসী এ তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসত।
লোহাগাড়ার পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।