মোঃ আব্দুল আউয়াল।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম প্রামাণ্য দলিল হল ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত সেই মহাকাব্যিক ভাষণ। এই ভাষণটি কেবল একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বা স্বাধীনতার প্রচ্ছন্ন ঘোষণা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি জাতির দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা, শোষণ এবং আর্তনাদের এক পরম শৈল্পিক ও দার্শনিক বহিঃপ্রকাশ। এই বক্তব্যের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি শব্দে মিশে আছে মহাকালের এক গভীর বেদনা। এই বেদনা কোনো ব্যক্তিগত বিয়োগগাথা নয়, বরং এটি একটি সমগ্র জনপদের অস্তিত্বের সংকট থেকে জন্ম নেওয়া এক সামষ্টিক হাহাকার। বঙ্গবন্ধু তাঁর অলৌকিক বাগ্মিতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে বাঙালির এই পুঞ্জীভূত বেদনাকে এক আধ্যাত্মিক ও অবিনাশী জাতীয়তাবাদী সত্তায় রূপান্তর করেছিলেন। সেই কারণেই অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও এই ভাষণ আজ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং চিরকালের জন্য অম্লান।
বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ৭ই মার্চের ভাষণকে কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে দেখলে এর প্রতি অবিচার করা হবে; এটি আসলে একটি ‘লিখনহীন মহাকাব্য’। গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়ক যেমন অমোঘ নিয়তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাহসের চরম পরাকাষ্ঠা দেখান, বঙ্গবন্ধু তেমনি সাত কোটি মানুষের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে পাকিস্তানি জান্তার বুলেট ও কামানের সামনে দাঁড়িয়ে অকুতোভয় চিত্তে মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। আব্রাহাম লিনকনের ‘গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস’ বা মার্টিন লুথার কিং-এর ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ ভাষণের সঙ্গে এর তুলনা হলেও, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তার স্বকীয়তায় অনন্য। যেখানে বিশ্বের অনেক বিখ্যাত ভাষণ ছিল লিখিত এবং পূর্বপরিকল্পিত, সেখানে বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের এই ভাষণ ছিল সম্পূর্ণ অলিখিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত। সাহিত্যের ভাষায় একে বলা যায় ‘অ্যাকশন ইন পয়েট্রি’। বিশ্ব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যগুলোতে যেমন একটি জাতির উত্থান, লড়াই এবং পরিণতির চিত্র থাকে, এই ভাষণেও বঙ্গবন্ধু গত তেইশ বছরের শোষণ-বঞ্চনার এক জীবন্ত উপাখ্যান রচনা করেছেন। নিউজউইক সাময়িকী তাঁকে যে ‘রাজনীতির কবি’ (Poet of Politics) আখ্যা দিয়েছিল, তার সার্থকতা নিহিত আছে এই ভাষণের ছন্দোবদ্ধ উপস্থাপনায়। এটি এমন এক সাহিত্যিক কর্ম যা কান দিয়ে শুনলে মনে হয় কোনো বীররসাত্মক কাব্যের আবৃত্তি চলছে।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণের শুরুতেই যে ‘দুঃখভারাক্রান্ত মন’-এর অবতারণা করা হয়েছে, তা মূলত তেইশ বছরের শোষণ ও লাঞ্ছনার এক ঐতিহাসিক নির্যাস। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১—এই দীর্ঘ সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর যে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করেছিল, তার প্রতিটি ক্ষত বঙ্গবন্ধু তাঁর হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। তিনি যখন বলেন, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়’—তখন সেই আকুলতা কেবল রাজনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে শোষিতের অন্তরাত্মার প্রতিধ্বনি। মহাকালের এই বেদনা মূলত একটি জাতির পরিচয় সংকটের বেদনা। যে জাতি শত বছর ধরে নিজের ভাষায় কথা বলার জন্য, নিজের অন্নের সংস্থানের জন্য এবং নিজের ভাগ্যবিধাতা নিজে হওয়ার জন্য লড়াই করছে, তাদের সেই দীর্ঘশ্বাসকে বঙ্গবন্ধু শব্দের তুলিতে এক মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন। এই বেদনার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল জন্মের আনন্দ, যা পরবর্তীতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম মানচিত্রের জন্ম দেয়।
এই ভাষণের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ওজোগুণ। সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্রে ওজোগুণ বলতে সেই ভাষাশৈলীকে বোঝায় যা শ্রোতার মনে তেজ, সাহস এবং উদ্দীপনা সঞ্চার করে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি শব্দ ছিল বজ্রনির্ঘোষ। ‘ভায়েরা আমার’, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব’ কিংবা ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’—এই বাক্যগুলোর মধ্যে যে ধ্বনিঝঙ্কার এবং সংক্ষুব্ধ প্রাণের তেজ রয়েছে, তা নিস্তেজ জনপদকে মুহূর্তের মধ্যে রণসাজে সজ্জিত করার ক্ষমতা রাখে। এই ভাষণের ভাষা ছিল একদিকে যেমন সরল ও প্রাঞ্জল, অন্যদিকে তেমনি তেজস্বী ও গম্ভীর। তিনি যখন বলেন, ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’—তখন সেই বাক্যের গঠনশৈলীতে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না, থাকে এক অপরাজেয় পৌরুষদীপ্ত সংকল্প। এই তেজস্বিতা কেবল শব্দের চয়নে নয়, বরং তাঁর কণ্ঠের উত্থান-পতন এবং উচ্চারণের বলিষ্ঠতায় মূর্ত হয়ে উঠেছিল। এটি ছিল মূলত এক শোষিত আত্মার বিদ্রোহের গর্জন, যা শব্দ ও বাক্যের গণ্ডি পেরিয়ে এক অলৌকিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
জাতীয়তাবাদ সাধারণত ভাষা, সংস্কৃতি বা ভূখণ্ডের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদকে এই পার্থিব সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে তাকে একটি অবিনাশী সত্তায় পরিণত করেছেন। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন যে, মৃত্যুভয়কে জয় করাই হলো প্রকৃত মুক্তি। যখন তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’—তখন তিনি আসলে একটি নশ্বর জনগোষ্ঠীকে এক অবিনাশী আত্মিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। শরীরকে হত্যা করা যায়, কিন্তু একটি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে যে গুলি করে স্তব্ধ করা যায় না, এই পরম সত্যটিই তিনি বাঙালির হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছিলেন। এই আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদই বাঙালিকে ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে আত্মরক্ষার শক্তি জুগিয়েছিল এবং ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অসীম সাহসে শত্রুর মোকাবিলা করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
৭ই মার্চের ভাষণ কেন কখনো পুরাতন হবে না, তার উত্তর নিহিত আছে এর সর্বজনীন আবেদনের মধ্যে। এটি কেবল ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ কোনো বক্তব্য নয়। এটি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের, যেকোনো সময়ের শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা। মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার তৃষ্ণা যত দিন থাকবে, তত দিন এই ভাষণ অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে। ইউনেস্কো কর্তৃক এই ভাষণকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ (Memory of the World International Register) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান মূলত এই সত্যেরই আন্তর্জাতিক সিলমোহর। এটি এখন আর কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির সম্পদ। যখনই কোনো শাসকশ্রেণি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করতে চাইবে, তখনই বঙ্গবন্ধুর সেই অবিনাশী হুংকার—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’—নিপীড়িত মানুষের মনে সাহসের সঞ্চার করবে।
বাঙালির ইতিহাসে ৭ই মার্চ তাই কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি চেতনার নাম। এই চেতনার মূলে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামক এক বিশাল হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব, যিনি নিজের বুকের ভেতরের বেদনাকে সারা বাংলার মানুষের বেদনায় রূপান্তরিত করেছিলেন। তিনি জানতেন, বেদনা যখন শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তখন তা অপরাজেয় হয়ে ওঠে। তিনি বাঙালির হাজার বছরের অলসতাকে এক নিমিষেই কর্মচঞ্চলতায় রূপান্তর করেছিলেন। তাঁর এই ভাষণের মাধ্যমেই বাঙালি তার আত্মপরিচয় খুঁজে পায়। আজ যে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা বাস করছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর মূলত সেই দিনই রেসকোর্স ময়দানে স্থাপিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে যে আধ্যাত্মিক সত্তার বীজ বপন করেছিলেন, তা আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ হলো বাঙালির আত্মার সঙ্গীত। এই সঙ্গীত কখনো পুরাতন হওয়ার নয়, কারণ এর সুর বাধা আছে বাঙালির হৃদস্পন্দনের সঙ্গে। মহাকালের সেই বেদনা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শেকড়ের কথা, আমাদের আত্মত্যাগের কথা। আর সেই ওজোগুণ সম্পন্ন তেজস্বী জাতীয়তাবাদী চেতনা আমাদের পথ দেখায় সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়ার। বঙ্গবন্ধু নেই, কিন্তু তাঁর সেই কালজয়ী শব্দগুলো আজ সাত কোটি থেকে সতেরো কোটি বাঙালির ধমনীতে প্রবহমান। এই আধ্যাত্মিক শক্তিই আমাদের রক্ষাকবচ, আমাদের পরিচয় এবং আমাদের আগামীর স্বপ্ন। ৭ই মার্চের ভাষণ তাই এক অনন্ত মহাকাব্য, যার প্রতিটি পঙক্তি বাঙালির অস্তিত্বের সমার্থক।