খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ সালে বর্তমান ইরাকের নিকটবর্তী গাওগামেলার প্রান্তরে সংঘটিত এক যুদ্ধ বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। এই যুদ্ধে মুখোমুখি হয়েছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য পারস্য এবং উদীয়মান ম্যাসিডোনীয় সামরিক শক্তি। একপক্ষে ছিলেন পারস্য সম্রাট দারিয়ুস তৃতীয়, অন্যপক্ষে তরুণ সেনাপতি আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
যুদ্ধের পটভূমি
পারস্য সাম্রাজ্য তখন পশ্চিম এশিয়ার বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু ম্যাসিডোনিয়ার রাজা আলেকজান্ডার একের পর এক অভিযানে পারস্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করতে শুরু করেন। এর আগে ইস্যুসের যুদ্ধে দারিয়ুস পরাজিত হলেও তিনি আবার বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং শেষ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গাওগামেলার সমতল ভূমি বেছে নেন।
দারিয়ুসের লক্ষ্য ছিল খোলা মাঠে সংখ্যাগত শক্তিকে কাজে লাগানো। ঐতিহাসিকদের মতে, পারস্য বাহিনীতে ছিল অসংখ্য অশ্বারোহী সৈন্য, রথ এবং বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা যোদ্ধা। অন্যদিকে আলেকজান্ডারের বাহিনী ছিল তুলনামূলক ছোট, কিন্তু অত্যন্ত প্রশিক্ষিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ।
যুদ্ধের কৌশল
গাওগামেলার যুদ্ধে আলেকজান্ডার অসাধারণ সামরিক কৌশল প্রদর্শন করেন। তিনি সরাসরি আক্রমণের পরিবর্তে ধীরে ধীরে ডানদিকে অগ্রসর হয়ে পারস্য বাহিনীকে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। এতে দারিয়ুসের সেনাবাহিনীর মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়।
এই সুযোগে আলেকজান্ডার তার অভিজাত অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে পারস্য সেনাবাহিনীর কেন্দ্রভাগে দ্রুত আঘাত হানেন। আক্রমণের তীব্রতায় দারিয়ুসের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে।
দারিয়ুসের পলায়ন
যুদ্ধের একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দারিয়ুস যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। তার পলায়নের খবর ছড়িয়ে পড়লে পারস্য সেনাদের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে কার্যত পারস্য সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। পরে আলেকজান্ডার ব্যাবিলন, সুসা এবং পার্সেপোলিস দখল করেন। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, গাওগামেলার যুদ্ধই আলেকজান্ডারকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজেতায় পরিণত করে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
গাওগামেলার যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল দুই সভ্যতা ও দুই সামরিক কৌশলের সংঘাত। এই যুদ্ধের পর গ্রিক সংস্কৃতি পশ্চিম এশিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং হেলেনিস্টিক যুগের সূচনা ঘটে।
আজও ইতিহাসবিদরা এই যুদ্ধকে সামরিক কৌশল, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে মূল্যায়ন করেন।