সাকিব আহসান প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা-এর কোষারাণীগঞ্জ ইউনিয়নে টাঙ্গন নদীর নির্ধারিত সীমানার বাইরে থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে এক ইজারাদারকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সোমবার (১১ মে) দুপুরে পরিচালিত এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন এন. এম. ইশফাকুল কবীর। অভিযানে সংশ্লিষ্ট ইজারাদার মোশারফের বিরুদ্ধে ‘বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ (সংশোধিত ২০১১) অনুযায়ী অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই টাঙ্গন নদীর নির্ধারিত বালু মহালের বাইরে বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন চলছিল। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি আশপাশের কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে এমন কর্মকাণ্ড নদীভাঙনের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তোলে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রাতের অন্ধকার কিংবা ভোরবেলা ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হতো। ভারী যানবাহনের চলাচলে গ্রামের সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ফসলি জমির মাটির গঠনও নষ্ট হচ্ছে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, অব্যাহতভাবে নদীর গভীরতা ও তীরের ভারসাম্য নষ্ট হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত ইজারার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেয়ে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় প্রশাসনের উপস্থিতি দেখে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। তারা আশা করছেন, এ ধরনের অভিযান নিয়মিত হলে অবৈধ বালু উত্তোলন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন শুধু পরিবেশের ক্ষতিই করে না, এটি একটি অঞ্চলের সামগ্রিক ভূ-প্রকৃতি ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নদীর তলদেশ অতিরিক্ত গভীর হয়ে গেলে সেতু, কালভার্ট ও তীররক্ষা বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়ে। একইসঙ্গে নদীভাঙনের কারণে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
বাংলাদেশে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নানা সময় দুর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংস ও সরকারি সম্পদ ক্ষতির ঘটনা সামনে এসেছে। এ কারণে সরকার ‘বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন’ প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় বালু উত্তোলনের নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অসাধু চক্র কিংবা প্রভাবশালী মহলের কারণে সেই আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
এ অবস্থায় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত মনিটরিং, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি। পাশাপাশি নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় জনগণকেও আরও সচেতন হতে হবে।
টাঙ্গন নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের বহু মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই স্বল্পমেয়াদি আর্থিক লাভের জন্য নদীর স্বাভাবিক অস্তিত্ব বিপন্ন করা হলে তার ক্ষতিকর প্রভাব বহন করতে হবে পুরো জনপদকেই।