২১ ডিসেম্বর ১৯৪৩: আকাশে শুরু, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে শেষ-
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে, ১৯৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর আলাস্কার আকাশে একটি নিয়মিত পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল এক ভয়াবহ বিপর্যয়ে। মার্কিন সেনাবাহিনীর বি-২৪ লিবারেটর বোমারু বিমানটি আলাস্কার ল্যাড ফিল্ড থেকে উড্ডয়ন করেছিল শীতকালীন কর্মক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য। বিমানে ছিলেন পাঁচজন ক্রু সদস্য।
প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড্ডয়নের সময় বিমানের একটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিশাল বোমারু বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় নিচে নামতে শুরু করে। পাইলট ও কো-পাইলট প্রাণপণ চেষ্টা করেও বিমানকে আর নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি।
প্যারাসুটে লাফ, তারপর নিঃসঙ্গতা-
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে কো-পাইলট প্রথম লেফটেন্যান্ট লিয়ন ক্রেন প্যারাসুট নিয়ে লাফ দেন। আরেকজন ক্রুও লাফ দিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু পরে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বাকি সদস্যরা বিমানেই প্রাণ হারান।
বরফে ঢাকা দুর্গম আলাস্কার পাহাড়ি অঞ্চলে অবতরণ করেন ক্রেন। চারদিকে কেবল বরফ, হিমশীতল বাতাস আর জনমানবহীন বন্য প্রকৃতি। তাপমাত্রা তখন শূন্যের ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে।
তার সঙ্গে ছিল মাত্র—
1. একটি বয় স্কাউট ছুরি,
2. দুই প্যাকেট দেশলাই,
3. এবং তার প্যারাসুট।
ক্ষুধা, ঠান্ডা আর মৃত্যুভয়-
প্রথম কয়েকদিন ক্রেন দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি অবস্থান করেন। উদ্ধারকারী দল আসবে—এই আশায় তিনি অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু কেউ এল না।
খাবারের অভাবে তিনি তুষার গলিয়ে পানি পান করতেন। ক্ষুধা এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি মুখভর্তি বরফ নিয়ে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন এটি যেন মিল্কশেক। পরে তিনি স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, ক্ষুধা ও একাকীত্ব তার মানসিক শক্তিকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল।

রাতগুলো ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। আগুন জ্বালিয়ে তিনি কোনোমতে শরীর গরম রাখতেন। প্যারাসুটের কাপড় জড়িয়ে ঘুমাতেন, কিন্তু ঠান্ডায় বারবার ঘুম ভেঙে যেত।
১২০ মাইলের মৃত্যুযাত্রা-
উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে এলে ক্রেন চার্লি নদীর ধার ধরে উত্তর দিকে হাঁটতে শুরু করেন। বরফের নদী পার হওয়ার সময় তিনি একাধিকবার বরফ ভেঙে পানিতে পড়ে যান। কয়েকবার অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
দীর্ঘ যাত্রার এক পর্যায়ে তিনি একটি পরিত্যক্ত শিকারি কেবিন খুঁজে পান। সেখানে ছিল কিছু টিনজাত খাবার, একটি রাইফেল, উষ্ণ পোশাক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। এই আবিষ্কারই তার জীবন রক্ষা করে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ তিনি কেবিন থেকে কেবিনে এগিয়ে যেতে থাকেন। প্রায় ১২০ মাইল পথ অতিক্রম করার পর ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে তিনি আরেকটি কেবিনে পৌঁছান, যেখানে একজন স্থানীয় শিকারি বাস করতেন।
কেবিনে ঢুকে তিনি বলেছিলেন:
“আমি যুক্তরাষ্ট্র আর্মি এয়ার ফোর্সের লেফটেন্যান্ট ক্রেন। আমি একটু সমস্যায় পড়েছিলাম। আপনাকে দেখে খুবই খুশি লাগছে।”
৮৪ দিন পর সভ্যতায় ফেরা-
দুর্ঘটনার দিন থেকে প্রায় ৮৪ দিন পর লিয়ন ক্রেন সভ্য জগতে ফিরে আসেন। উদ্ধার হওয়ার সময় তার চেহারা এতটাই বদলে গিয়েছিল যে আয়নায় নিজেকে দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে যান। পরে তিনি বলেছিলেন, তাকে দেখতে “প্রাগৈতিহাসিক কোনো মানুষের মতো” লাগছিল।

ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর বেঁচে থাকার ঘটনা-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসংখ্য বীরত্বগাথার মধ্যে লিয়ন ক্রেনের গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোনো বিশেষ আর্কটিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই, সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে, তীব্র শীত ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে ৮৪ দিন লড়াই করে বেঁচে থাকা আজও মানবিক সাহস, ধৈর্য ও বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।