সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
পথের ধারে কিংবা কোনো মেলা-উৎসবের ভিড়ে হঠাৎ চোখে পড়ে রঙিন এক ছোট্ট দোকান। সাজানো থাকে হাওয়াই মিঠাই, মোরব্বা, বাতাসা আর খাজা বাদশা। বাহারি রঙ ও পরিচিত স্বাদের এসব মিষ্টান্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকে কত মানুষের জীবনের গল্প। তেমনই এক গল্পের নাম মুকুল রানা। বয়স মাত্র ২৬। বাড়ি গোগোর ঝাড়বাড়ি। পৈতৃক বা পারিবারিক ব্যবসার ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে তিনি আজও মানুষের হাতে তুলে দেন শৈশবের সেই চেনা মিষ্টির স্বাদ।
মুকুলের ব্যবসার পরিধি খুব বড় নয়, নেই ঝাঁ-চকচকে কোনো বিপণিবিতানও। তাঁর পুঁজি মূলত অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম আর মানুষের ভালোবাসা। হাওয়াই মিঠাই, মোরব্বা, বাতাসা ও খাজা বাদশাই তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। ছোট্ট এই ব্যবসার মধ্যেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন জীবনের অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং নিজের পরিচয়ের একটি জায়গা।
মুকুল বলেন, এসব মিষ্টান্ন বিক্রি করা তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা। পরিবারের অন্য ভাইয়েরাও নিজ নিজ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কেউ হয়তো অন্য পেশা বা ব্যবসার পথ বেছে নিয়েছেন, কিন্তু মুকুল ধরে রেখেছেন পরিবারের পুরোনো ঐতিহ্যের এই মিষ্টি ব্যবসা। তাঁর কাছে এটি শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়; বরং পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ স্মৃতির উত্তরাধিকার।
প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয় তাঁর কর্মব্যস্ততা। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে ঘুরে কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে বসে তিনি বিক্রি করেন মিষ্টান্নগুলো। ক্রেতাদের কেউ হাওয়াই মিঠাই হাতে নিয়ে ফিরে যান শৈশবের স্মৃতিতে, কেউ বাতাসার স্বাদে খুঁজে পান গ্রামবাংলার পুরোনো দিনের গন্ধ। আবার কারও পছন্দ খাজা বাদশা কিংবা মোরব্বা। ছোটদের চোখে এসব খাবার আনন্দের, আর বড়দের কাছে অনেক সময় তা স্মৃতির দরজা খুলে দেয়।
এই ব্যবসা থেকে মুকুলের প্রতিদিন আয় হয় প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। মাসের সব দিন সমান যায় না, কখনো বিক্রি বাড়ে, কখনো কমে। তবুও নিজের শ্রমে অর্জিত এই আয় দিয়েই তিনি জীবনকে এগিয়ে নিচ্ছেন। হিসাবের খাতায় এটি হয়তো খুব বড় কোনো ব্যবসার অঙ্ক নয়, কিন্তু একজন তরুণের স্বনির্ভর হয়ে ওঠার গল্পে এর মূল্য অনেক।
মুকুল রানার গল্পে তাই শুধু একজন মিষ্টান্ন বিক্রেতার পরিচয় নেই। আছে শ্রমের মর্যাদা, পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক নীরব সংগ্রাম। আধুনিকতার দ্রুতগতির সময়ে যখন অনেক পুরোনো পেশা হারিয়ে যাচ্ছে, তখন মুকুলের মতো মানুষরা সেই হারিয়ে যেতে বসা স্বাদের স্মৃতি বয়ে চলেছেন।
হাওয়াই মিঠাইয়ের মতোই তাঁর জীবনের স্বপ্নগুলো হয়তো নরম ও রঙিন; বাতাসার মতোই সরল তাঁর পথচলা। প্রতিদিনের পরিশ্রমে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন জীবিকার আকার বড় হওয়া জরুরি নয়, তার ভেতরে যদি থাকে সততা, শ্রম আর আত্মমর্যাদা, তবে ছোট্ট ব্যবসাও হয়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর জীবনের অবলম্বন। মুকুলের হাতে তাই শুধু মিষ্টি নয়, বিক্রি হয় গ্রামবাংলার এক টুকরো ঐতিহ্য, এক মুঠো শৈশব আর পরিশ্রমে গড়া স্বপ্ন।