নজরুল ইসলাম যশোর প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম চামড়ার হাট যশোরের রাজারহাটে বসেছে ঈদ পরবর্তী প্রথম চামড়ার হাট। তবে হাটে আসা মৌসুমী ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, তারা চামড়ার আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন না। অন্যদিকে পাইকারদের দাবি, মান অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কেনা হচ্ছে।যশোরের রাজারহাট দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় চামড়ার বাজার। যশোরসহ খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, ঈশ্বরদী ও নাটোরের ব্যবসায়ীদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
পবিত্র ঈদুল আজহার পর আজ শনিবার (৩০ মে) বসেছে এই হাটের প্রথম চামড়ার বাজার। কোটি কোটি টাকার চামড়া হাতবদল হলেও এবারের প্রথম হাটের চিত্র কিছুটা ভিন্ন।দূর-দূরান্ত থেকে চামড়া নিয়ে আসা মৌসুমী ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে এসে তারা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। মান ও আকারভেদে গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। আর ছাগলের চামড়া বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিস মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকায়। ফলে চামড়া কেনা, লবণ দেয়া ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। অনেকেই ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে এখন বিপাকে পড়েছেন। মৌসুমী ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন বলেন, বাগেরহাট থেকে চামড়া নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে ক্রেতা নেই বললেই চলে। প্রতি পিস চামড়ার দাম ১৫০ থেকে ২৫০ টাকার বেশি বলা হচ্ছে না। এতে সবই লোকসান হচ্ছে। বাইরের কোনো ক্রেতা না থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে চামড়া পানির দামে বিক্রি হচ্ছে। বাড়িতে আরও চামড়া পড়ে আছে, পরের হাটে আনব কি না, সেটিও বুঝতে পারছি না। লবণ, শ্রমিকের মজুরি ও যাতায়াত খরচ মিলিয়ে কোনোভাবেই পোষাচ্ছে না।
ব্যবসায়ী নারায়ণ শীল বলেন, সরকার গরুর চামড়ার মূল্য ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে ৪০ টাকা ফুটেও বেচাকেনা হচ্ছে না। আর ছাগলের চামড়ার তো কোনো দামই নেই। ১২টি ছাগলের চামড়া বিক্রি করেছি মাত্র ১২০ টাকায়।অধির দাস নামে আরেক বিক্রেতা জানান, গ্রাম থেকে ৫০০ টাকা করে গরুর চামড়া কিনেছি। প্রতি চামড়ায় ১০০ টাকা করে লবণের খরচ হয়েছে। অথচ হাটে এসে সেই চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে ৬০০ টাকা দরে। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ২০ টাকায়। ফলে গাড়ি ভাড়া ও নিজের শ্রমের মূল্য ধরলে সবই লোকসান।নড়াইলের ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন বলেন, ৩৭৫ পিস চামড়া নিয়ে এসেছিলাম। সবচেয়ে ভালো চামড়াটি বিক্রি হয়েছে ৯০০ টাকায়। বাকি চামড়াগুলো এখনও বিক্রি করতে পারি নি। যে দাম বলা হচ্ছে, তাতে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। ঋণ নিয়ে ব্যবসা করি এবং বাড়িতে আরও ৪৫০ পিস চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রেখেছি। সামনের হাটে আনব। তবে দাম কম থাকলে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
তবে বিক্রেতাদের এসব অভিযোগ মানতে নারাজ পাইকারি ক্রেতারা। তাদের দাবি, ভালো মানের চামড়া সরকার নির্ধারিত দামেই কেনা হচ্ছে। অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ী অভিজ্ঞতার অভাবে কাটা, ছেঁড়া বা রোগাক্রান্ত নিম্নমানের চামড়া কিনে আনছেন, যার কারণে তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন।
পাইকারি ক্রেতা আব্দুল হান্নান বলেন, আজ বাজারে ভালো ও খারাপ-দুই ধরনের চামড়াই এসেছে। ভালো চামড়া ভালো দামেই বিক্রি হচ্ছে। নিজেও সর্বোচ্চ ৯০০ টাকায় একটি চামড়া কিনেছি। ফুট হিসেবে হিসাব করলে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দাম দেয়া হয়েছে। ভালো মানের চামড়াগুলো এখনও বাজারে আসেনি। সামনের হাটে আরও ভালো চামড়া আসবে এবং বিক্রেতারা ভালো দাম পাবেন।আড়তদার হাসিব চৌধুরী বলেন, আজকের বাজার মোটামুটি ভালো এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের কাছাকাছি দামে চামড়া বেচাকেনা হচ্ছে। যারা লোকসানের কথা বলছেন, তারা মূলত মৌসুমী ব্যবসায়ী। অভিজ্ঞতার অভাবে তারা কম দামের চামড়া বেশি দামে কেনেন এবং সঠিকভাবে লবণও দিতে পারেন না। ফলে বাজারে এসে প্রত্যাশিত দাম পান না।তিনি আরও বলেন, চামড়ার দাম নির্ভর করে তার মানের ওপর। ভালো চামড়ার দাম বেশি, খারাপ চামড়ার দাম কম। আজ বাজারে নিম্নমানের চামড়া বেশি এসেছে। তবুও প্রায় সব চামড়াই বিক্রি হয়ে গেছে। সামনে আরও কয়েকটি হাট রয়েছে, তখন বাজার আরও ভালো হবে।
আরেক আড়তদার আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ঈদের পর বেশিরভাগ ব্যবসায়ী চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করেছেন। প্রথম হাটে অনেকে বাজার পরিস্থিতি দেখতে কিছু চামড়া এনেছেন। আগামী মঙ্গলবার ও শনিবারের হাটে চামড়ার আমদানি বাড়বে। আজ ভালো মানের চামড়া ভালো দামেই বিক্রি হয়েছে। যেসব চামড়ার দাম কম, সেগুলোর অনেকগুলো অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। না বুঝে এসব চামড়া কেনার কারণেই লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় চামড়া সংরক্ষণের খরচও বেড়েছে। এ খাতকে রক্ষা করতে সরকারের আরও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।
হাটের ইজারাদার রাজু আহমেদ বলেন, ঈদ পরবর্তী প্রথম হাট হিসেবে চামড়ার আমদানি কিছুটা কম হয়েছে। ঈদের পর চামড়া সংগ্রহ, লবণ দেয়া এবং সংরক্ষণের উপযোগী হতে কয়েকদিন সময় লাগে। তাই অনেক ব্যবসায়ী এখনও চামড়ার গাঁট ভাঙেননি। হয়ত আগামী হাটে চামড়ার আমদানি বাড়বে এবং বাইরের ক্রেতারাও আসবেন। তখন বাজার পুরোপুরি জমে উঠবে।
হাট ইজারাদারের তথ্য অনুযায়ী, আজকের হাটে প্রায় ৫ হাজার চামড়া উঠেছে। আগামী হাটগুলোতে সঠিক তদারকি ও চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।