নিজস্ব প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ক্রমাগত বৃক্ষনিধনের মধ্যে যখন সবুজ হারানোর শঙ্কা বাড়ছে, তখন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার এক প্রকৃতিপ্রেমী যুবক নীরবে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ। তিনি উপজেলার যাদবপুর গ্রামের শেখ হোসেন আলীর ছেলে শেখ কামরুজ্জামান। কোন সরকারি প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই নিজের অর্থ ও শ্রমে উপজেলার বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে খেজুর, তাল, বাবলা ও নিম গাছের বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ভবিষ্যতের সবুজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলাই তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সকাল হলেই সে বস্তা হাতে কয়েকজন ছোট ভাই ও বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিভিন্ন গ্রামে। গ্রামের গাছতলা ঘুরে ঘুরে খেজুর, তাল, বাবলা ও নিমের বীজ সংগ্রহ করে নিয়ে আসে বাড়িতে। কয়েক দিনের সংগ্রহ করা বীজের বস্তা সাইকেলের পেছনে বেঁধে বেড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকায়। তারপর ফাঁকা জায়গা দেখে রাস্তার দুই পাশে ছিটিয়ে দেয় সেই বীজ।

তাঁর বিশ্বাস, সব বীজ অঙ্কুরিত না হলেও কিছু গাছ বড় হবে, যা ভবিষ্যতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, ছায়া সৃষ্টি, ভূমি ক্ষয় রোধ করবে ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে।
প্রলয়কারী ঘূর্ণিঝড় আম্পান, সিডরসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ও তাকে দেখা যায় সেচ্ছাসেবী হিসেবে উপকূল রক্ষা বাঁধের কাজ করতে। এছাড়াও বাঁশের সাঁকো তৈরি, পানির ফিল্টার পরিষ্কার করে থাকেন। মানুষের বিপদে পাশে থাকাই তার নেশা। প্রতি তিন মাস পরপর সে সেচ্ছায় রক্ত দান করেন। গত ছয় বছর ধরে গ্রামে গ্রামে গিয়ে শিশুদের সাঁতার শিখিয়ে চলেছে। মাদক, জুয়া ও মোবাইল গেম শিশু ও যুবকদের যাতে আকৃষ্ট করতে না পারে সেই লক্ষ্যে কামরুজামান বিদ্যালয়ে ও খেলার মাঠে বিভিন্ন সচেতনতা মূলক ক্যাম্পাইন করেন এবং খেলাধুলা শেখান।
বৃক্ষ প্রেম ছাড়াও কামরুজ্জামান বই পড়তে ভালোবাসে। প্রতিদিন বিকেল হলেই সাইকেল নিয়ে শ্যামনগর উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরিতে বই ও পত্র-পত্রিকা পড়তে চলে যান। কোন কোন দিন সাইকেল খারাপ থাকলে ৫ কিলোমিটার পথ হেঁটেই যাওয়া-আসা করে। মাঝে মধ্যে এনজিওর সেমিনারে তার ডাক পড়ে। এনজিওর দেওয়া সেই সম্মানী, ভ্যান ভাড়া ও চা না খেয়ে চায়ের খরচ বাঁচিয়ে সেই টাকা দিয়ে গাছ কিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে লাগিয়ে থাকেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে কামরুজ্জামান সাইকেলের পিছনে বীজের বস্তা নিয়ে উপজেলা গাবুরা, রমজান নগর, শ্যামনগর, আটুলিয়া, নূরনগরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের রাস্তার ধারে খালি জায়গা, বাঁধসংলগ্ন এলাকায় বীজ ছড়িয়ে দেন। ইতোমধ্যে তার ছড়িয়ে দেওয়া অনেক বীজ থেকে চারা গজিয়েছে, যা স্থানীয়দের নজর কেড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চল দ্বীপ বেষ্টিত গাবুরা ইউনিয়নের উপকূল রক্ষা বাঁধের দুই পাশ দিয়ে খেজুর, তাল, বাবলা ও নিমের বীজ বপন করেন। এ কাজে তার নিজের কয়েকজন বন্ধু ও গাবুরা ইউনিয়নের মেম্বরসহ কয়েক জন শিশু ও তরুণ তাকে বীজ বপনে সাহায্য করেন।
প্রকৃতিপ্রেমী কামরুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই গাছপালার প্রতি আমার ভালোবাসা। অনেক জায়গায় দেখি রাস্তার পাশে খালি জমি পড়ে থাকে। তাই ভাবলাম, যদি খেজুর, তাল বা বাবলার বীজ ছড়িয়ে দিই, তাহলে অন্তত কিছু গাছ তো বড় হবে। এভাবেই আমার এই উদ্যোগ শুরু। খেজুর, তাল, বাবলা ও নিমের বীজ সহজে জন্মায় এবং পরিবেশের জন্যও উপকারী। আমার একটাই স্বপ্ন, আগামী প্রজন্ম যেন আরও সবুজ বাংলাদেশ পায়।

কামরুজ্জামানের ভাষ্য, আমি বিশ্বাস করি, হাজার হাজার বীজের মধ্যে যদি কিছু গাছও বেঁচে থাকে, তাহলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেটি বড় সম্পদ। কোনো ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, প্রকৃতি ও মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেই এই কাজ করছি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় জনপদে সবুজের পরিধি বাড়ানোর এই নীরব উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে।
সরেজমিনে কয়েকটি এলাকায় দেখা যায়, রাস্তার পাশে ছোট ছোট খেজুর, তাল, বাবলা ও নিমের চারা গজিয়ে উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, এসব চারার বেশিরভাগই কামরুজামান এর ছড়িয়ে দেওয়া বীজ থেকে জন্মেছে। তবে পরিচর্যার অভাবে অনেক চারা নষ্টও হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ মাসুদুর রহমান, শেখ আজাদ আলী, বাসিন্দা নজরুল ইসলামরা বলেন, প্রথমে আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিইনি। পরে দেখি সত্যিই অনেক জায়গায় নতুন গাছ জন্মাচ্ছে। একটি ছেলে একাই পরিবেশের জন্য এত কিছু করছেন, এটি আমাদেরও অনুপ্রাণিত করে।
প্রত্যক্ষদর্শী বনশ্রী মন্ডল, মনিরুল ইসলাম বলেন, কামরুজামানকে প্রায়ই রাস্তার পাশে বীজ ফেলতে দেখেছি। তখন অনেকে উপহাস করলেও এখন অনেকেই তার কাজের প্রশংসা করছেন।

লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দেশীয় প্রজাতির গাছের গুরুত্ব অনেক। ভূমি ধ্বস ও মাটির ক্ষয় রোধে খেজুর, তাল, বাবলা ও নিম গাছ অত্যন্ত শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে। বাবলা গাছের বিস্তৃত ও শক্ত শিকড় মাটির উপরিভাগ এবং গভীর স্তরকে শক্ত করে আটকে রাখে, অন্যদিকে খেজুর গাছের শক্তিশালী ও গভীর শিকড় মাটির স্থায়িত্ব বাড়ায় এবং নদীর পাড় বা ঢালু স্থানে মাটি ধসে পড়া রোধ করে। তাল গাছের আঁশযুক্ত শিকড় মাটির নিচে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যা মাটির গভীরে বিশাল একটি নোঙর তৈরি করে ভূমি ধ্বস ঠেকায়। বিশেষ করে তাল গাছ বজ্রপাত রোধক হিসেবে কাজ করে। কামরুজামান এর মতো ব্যক্তিগত উদ্যোগ পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব চারা সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের সচেতন হওয়া দরকার।
শ্যামনগর সামাজিক বন বিভাগের এক কর্মকর্তা ইসহাক প্রামিন বলেন, দেশীয় প্রজাতির গাছের বিস্তারে এ ধরনের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বীজ ছড়ানোর পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণও প্রয়োজন। সঠিক স্থানে উপযুক্ত দেশীয় প্রজাতির বীজ ব্যবহার করলে সফলতার সম্ভাবনা বেশি। বন বিভাগ এ ধরনের সচেতনতামূলক উদ্যোগকে স্বাগত জানায় ও সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক ।

শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, পরিবেশ রক্ষায় একজন সাধারণ নাগরিকের এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সরকারি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এ ধরনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা গেলে সবুজায়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।